হিন্দু সংহতির লক্ষ্য কি? (১)

এই নিখিল বিশ্ব একটা সিস্টেমের মধ্যে বাঁধা আছে। এই সৌরজগতের সব কয়টি গ্রহ সূর্যের চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথ ধরে, নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরছে। উপগ্রহ গুলো আবার এক একটা নির্দিষ্ট গ্রহকে কেন্দ্র করে একই রকম ভাবে নির্দিষ্ট কক্ষপথ ধরে নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরছে। অনন্তকাল ধরে এই প্রক্রিয়া চলছে, তার কোনও ব্যতিক্রম নেই। একটা গ্রহও ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে না, একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করছে না অথবা সূর্যের উপরেও আছড়ে পড়ছে না। সেন্ট্রিপিটাল ফোর্স এবং সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সের ভারসাম্য অনাদি অনন্তকাল ধরে এই ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে। এই ভারসাম্য কোনও কারণে নষ্ট হলে সৌরজগত সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে।
পৃথিবী আবার তার নিজের অক্ষকে কেন্দ্র করে লাট্টুর মত ঘুরছে। আমরা এই পৃথিবীতে বাস করছি। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য পশুপাখী, গাছপালা, জল এমনকি বায়ুমন্ডল এই পৃথিবীর পিঠের উপরে অবস্থান করছে। মাধ্যাকর্ষণের দ্বারা পৃথিবী আমাদের সবাইকে কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করছে, ফলে আমরা পৃথিবীর এই আবর্তন গতি সত্ত্বেও মহাশূন্যে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছি না। এই আকর্ষণ এবং গতিজনিত বিকর্ষণ বলের  ভারসাম্য যদি কোনও কারণে নষ্ট হয়ে যায়, ভাবুনতো পরিস্থিতিটা কী হতে পারে?
আবার পৃথিবীর সমস্ত জীব ও জড় কোনও না কোনও ভাবে পরস্পরের উপরে নির্ভরশীল। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেও একটা সমন্বয় আছে, যার ফলে প্রকৃতিতে একটা ভারসাম্য রক্ষিত হচ্ছে। ভাবুন তো যদি পর্যাপ্ত পরিমান বায়ুর অভাব হয় অথবা বায়ু দুষিত হয়ে যায়, তাহলে মানুষ, পশুপাখী কিংবা গাছপালার অস্তিত্ব কতটা সংকটগ্রস্থ হবে! অস্তিত্ব রক্ষায় মাটি এবং জলের ভুমিকাও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। আবার সাতদিন যদি পৃথিবীতে সূর্যের আলো না পরে তাহলে ভাবুন তো এই সৃষ্টির কী হবে? আবার দেখুন গাছপালার সাথে জীবের সম্পর্ক কীভাবে ওতপ্রত জড়িয়ে আছে! গাছ আমাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দিচ্ছে, আমরা গাছকে তার জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন ডাই অক্সাইড দিচ্ছি। এছাড়াও গাছ আমাদের খাদ্য, ঔষধি এমনকি প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে জ্বালানির যোগান দিচ্ছে। আবার গাছপালা থাকায় মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বাড়ছে, প্রকৃতির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকছে, বৃষ্টিপাতের মাত্রা ঠিক থাকছে। এর বিনিময়ে কি আমাদের কর্তব্য নয় গাছের সংরক্ষণ করা? আমরা যদি গাছ বাঁচাতে না পারি, গাছ কেটে বনাঞ্চল ধ্বংস করি তাহলে এই ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং পরিনামে এই সৃষ্টিই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। এই কথা উপলব্ধি করেই আজকে সারা বিশ্ব গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে চিন্তিত। পরিবেশ রক্ষায় সবাই সচেষ্ট হয়েছেন, বৃক্ষরোপনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, জল সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, বায়ুমন্ডলের ওজন স্তর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে হাহুতাশ শোনা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। একই রকম ভাবে মানুষের সাথে পশুপাখীর সম্পর্ক এমনকি মানুষের সাথে মানুষের এবং পশুপাখীদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্কেরও একটা প্রকৃতি নির্দিষ্ট ভারসাম্য আছে। চোখ মেলে তাকালেই সৃষ্টির সমস্ত উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের একটা ভারসাম্য সহজেই দেখা যায়। খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে মানুষ হল প্রকৃতির সমস্ত উপাদানের মধ্যে একটি উপাদানমাত্র এবং সে অন্যান্য উপাদান গুলোর উপরে ১০০ শতাংশ নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাকে স্বীকার করে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতার ভাব রেখে তাদের সংরক্ষণ করাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার উপায়- এই সত্যের সম্মুখীন মানুষকে আজ না হোক কাল হতেই হবে।
চার্লস ডারউইনের Struggle for Existence এবং Survival of the Fittest- এর তত্ত্ব অনুযায়ী আপাত দৃষ্টিতে প্রকৃতির উপাদানগুলোর মধ্যে একটা সংঘর্ষের আভাস দেখা গেলেও একটু গভীর ভাবে দেখলে তাদের মধ্যে একটা সমন্বয়ের স্পষ্ট উপস্থিতি আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। যে সমন্বয়ের দর্শন ডারউইন সাহেব না করলেও ভারতের মুনি ঋষিরা কিন্তু অনেক আগেই করতে পেরেছিলেন। তাই এই মাটি থেকে সমগ্র সৃষ্টি চরাচরের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছিল- “সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ/ সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু মা কশ্চিৎ দুঃখভাগ ভবেৎ।” এই কারণেই এই মাটিতে শুরু হয়েছিল প্রকৃতি পূজার পরম্পরা। আমাদের এই মাটি শুধু সকল জীবের মধ্যে শিবের দর্শন করার শিক্ষা দেয় নি, জড় পদার্থের মধ্যেও ঈশ্বর দর্শন করার শিক্ষা দিয়েছিল। মাটিকে মায়ের স্থান দেওয়া, বায়ু-অগ্নি-জলকে দেবতার স্থান দেওয়ার অর্থ ছিল প্রকৃতির এই উপাদানগুলির গুরুত্বকে স্বীকার করা। এইভাবেই জীবনকে দর্শন করেছিলেন আমাদের মুনি-ঋষিরা যে জীবন দর্শনের সার কথা ছিল Live and Let Live.
সৃষ্টির সমস্ত উপাদানের মধ্যে অন্তর্নিহিত সমন্বয়কে ব্যাহত না করার জন্য প্রয়োজনীয় আচরণবিধিকেই আমাদের এই পুণ্যভূমিতে ‘ধর্ম’ বলা হয়েছিল। মনে করা হত এই ধর্ম বা আচরণবিধিই Eco Balance রক্ষা করতে সক্ষম যার পরিনামে সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্বের নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত হতে পারে। তাই বলা হত ‘ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ’ অর্থাৎ ধর্ম রক্ষিত হলে ধর্মও রক্ষা করবে। তাহলে সংঘাত কি নেই? অবশ্যই আছে।     
কেউ কেউ কায়েমী স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই সমন্বয়ের নিয়মকে অস্বীকার করে। তারা প্রাকৃতিক সম্পদকে মানুষের অপরিমিত ভোগের সামগ্রী মনে করে যথেচ্ছভাবে প্রকৃতির শোষণ করে। তারা নিজেদের ভোগ বিলাসিতা এবং ক্ষমতার দম্ভে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষদেরও শোষণ করে, মানুষের উপরে অত্যাচার করে। যখন কেউ নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুখভোগের উদ্দেশ্যে অন্য সকলকে শোষণের জাতাকলে নিষ্পেশিত করে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, তখনই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় আর এই সংঘর্ষ তখন সৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই সংঘর্ষ তখন একটা Necessary Evil হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই Eco Balance কে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে সংঘাত বা যুদ্ধ করাও ধর্ম। এই ধর্ম পালনের তাগিদেই ভগবান রামচন্দ্র প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ‘নিশিচরহীন করেঙ্গে ধরতী’। যারা Live and Let Live- এই মহান জীবনাদর্শকে ধ্বংস করতে সক্রিয় তাদের সাথে সংঘাতে যাওয়া এবং তাদের বিনাশ করাও যে ধর্ম, তার শিক্ষা এখান থেকেই পাওয়া যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণও অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিলেন এই একই কারণে। তাই এই যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলা হয়।
সুতরাং এই মাটিতে যে জীবনদর্শনের বিকাশ হয়েছিল তার মূল কথা ছিল সমন্বয়। Live and Let Live এর এই আদর্শকে কায়েম রাখার জন্য উপযুক্ত আচরণবিধিই ছিল ধর্মের পরিভাষা। আমাদের দেবভূমির উপরে গড়ে ওঠা এই জীবনদর্শনের নামই সনাতন জীবনদর্শন। ‘সনাতন’ এই কারণে যে, বিশ্ব চরাচরের মধ্যে অন্তর্নিহিত সমন্বয়ের এই সত্য চিরন্তন। বাঁচতে হলে প্রকৃতিকে শোষণ করা যাবে না- এই ধর্ম স্থান, কাল এবং পাত্র ব্যতিরেকে সর্বদা সত্য। সুখে থাকতে হলে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়াতে হবে, সকলের মঙ্গল কামনা করতে হবে- এই ধর্মও সেই রকমই সর্বদা সত্য। আবার শান্তিতে থাকতে হলে ভাল লোকেদের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং দুষ্কৃতিদের দমন করার জন্য লড়াই করতে হবে- এই ধর্মও সর্বদা সত্য। তাই আমাদের ধর্মের নামও সনাতন ধর্ম। আমাদের জীবনদর্শন কোনও লিখিত সংবিধান নয়, আমাদের ধর্মও একটি চুক্তিপত্র নয়- এ হল সৃষ্টি চরাচর যে নিয়মাবলী মেনে অনাদি অনন্তকাল ধরে একটা ভারসাম্য রক্ষা করে তার নিজের গতিতে চলছে- সেই নিয়মাবলীর আবিষ্কার।
গবেষণার ফলশ্রুতিই হল আবিষ্কার। একটা সাধারণ সূত্র আবিষ্কার হলেই সেবিষয়ে গবেষণা শেয হয়ে যায় না। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং বিভিন্ন আঙ্গিকে সেই সূত্রের প্রয়োগ এমনকি বার বার তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যও গবেষণা চলতে থাকে। গবেষণা বন্ধ হয়ে গেলে অগ্রগতিও থেমে যায়। তাই সনাতনী জীবনাদর্শের বৈশিষ্ট্য হল গবেষণা, প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা। দর্শন মানে দেখা। সত্যকে দেখার পরেই বিশ্বাস করতে হবে, তার আগে নয়। অন্যের চোখ দিয়ে দেখায় সন্তুষ্ট হওয়াকে স্বীকার করে না সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গী। স্বামী বিবেকানন্দ ছোটবেলায় যেমন গাছে দোল খেতে খেতে বন্ধুদের বলেছিলেন, গাছে ব্রহ্মদৈত্য আছে কিনা সেটা নিজের চোখে দেখার পরেই তিনি বিশ্বাস করবেন। সেই স্বামীজীই পরে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, ‘আপনি নিজে ঈশ্বরকে দেখেছেন’? তাই এই মাটি হচ্ছে Land of seekers, not a land of believers. এই উদার এবং যুক্তিপূর্ণ সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গীই হচ্ছে ক্রমবিকাশের প্রধান শর্ত। বিকাশের চরম পর্যায়ে সমাজকে পৌঁছাতে হলে এই Openness এর সংরক্ষণ করতে হবে।
আমাদের পুণ্য বঙ্গভূমির নিরাপত্তার সাথে সাথে এই ভূমিতে উৎপন্ন সনাতনী জীবনদর্শন- Live and Let Live এবং চিন্তার এই Openness কে সংকীর্ণ আব্রাহামিক মতবাদ, ব্যর্থ কমিউনিস্ট মতবাদ এবং আরও অনেকগুলি বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির যৌথ আক্রমণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য একটা বড় লড়াই আমাদের লড়তে হবে। হিন্দু সংহতিকে এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে। এই গুরু দায়িত্ব পালন করার শক্তি ও সামর্থ্য অর্জন করাই এখন হিন্দু সংহতির সদস্যদের প্রধান কাজ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s