ভারতে গোহত্যা- শুধুই কি খাওয়ার জন্য?

গরু কে কেউ মা বললেও যেমন আমার আপত্তি নেই, আবার গরুকে কেউ নিছক খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করলেও আমার কোন আপত্তি নেই৷ কারণ শ্রদ্ধা মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে তৈরী হয়৷ এই বিশ্বাস কতটা যুক্তিপূর্ণ সেটা সেই বিশ্বাসী ব্যক্তির মানসিক গঠন, তার শিক্ষা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির গতি প্রকৃতির বিষয়ে তার knowledge এবং observation ইত্যাদির উপরে নির্ভর করে৷ কিন্তু যতই অযৌক্তিক মনে হোক না কেন, যে কোন কিছু বিশ্বাস করার পূর্ণ স্বাধীনতা মানুষের আছে যতক্ষণ না তার সেই বিশ্বাস অন্যের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে, তার বিশ্বাস সমাজ এবং প্রাকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করছে৷ দেশ, জাতি তথা বিশ্বমানবতার স্বার্থের পরিপন্থী না হওয়া পর্যন্ত কোন ব্যক্তির বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই৷ তবে মানুষের বিশ্বাস নিশ্চই যুক্তি নির্ভর হওয়া উচিত৷ পাশাপাশি সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও কিছু কিছু বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা মানুষের মনে পরম্পরাগতভাবে তৈরী হয়ে থাকে, হয়তো তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে আছে৷

আমি সুনামীর পরে লিটল আন্দামানে গিয়েছিলাম৷ সেখানে স্থানীয় বাসীন্দাদের মধ্যে একজন তার অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে বললেন, কয়েক পুরুষ ধরে সেখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস, সমুদ্র যখন দূরে সরে যায় তখন মানুষেরও উচিত সমুদ্র থেকে দূরে সরে যাওয়া৷ সুনামীর ঢেউ যখন আছড়ে পড়ল, ঠিক তার আগে সমুদ্রের জল অনেক দূরে পিছিয়ে গিয়েছিল৷ বিশ্বাসের ভিত্তিতে যারা তা দেখে তখন সমুদ্র থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, তারা বেঁচে গিয়েছিলেন৷ আর যারা এই বিশ্বাসকে কুসংস্কার মনে করে তাচ্ছিল্য করেছিলেন, তারা আজ আর বেঁচে নেই! অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না জানলেও অভিজ্ঞতা ও observation এর ভিত্তিতে যে বিশ্বাস তৈরী হয়, তা নিশ্চই উপহাসের বিষয় হতে পারে না৷ গরুকে মা বলতে অস্বীকার করার অধিকার আমার আছে৷ কিন্তু কেউ যদি গরুকে মা বলে বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা করে – তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাটাকে আমি কোনভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে করি না৷ এটাও এক ধরণের সঙ্কীর্ণ মানসিকতার লক্ষণ৷

দ্বিতীয় বিষয় খাদ্যাভ্যাস৷ মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরী হয় মূলতঃ খাদ্যের খাদ্যগুণ এবং তার availability র উপরে ভিত্তি করে৷ মানুষ সব সময় সস্তায় পুষ্টিকর খাবার খোঁজে৷ যে খাবার যত বেশী available, তার দাম তত কম৷ আমরা ছোটবেলায় পাঁঠার মাংসই বেশী খেতাম৷ ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকল, দেশী মুরগী সেই জায়গা দখল করতে লাগলো৷ প্রথম প্রথম মুরগী সাধারণ হিন্দু পরিবারগুলোতে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷ অনেক বাড়ীতে আলাদা বাসন ছিল মুরগী রান্না করার জন্য! পুরোনো লোকেরা বলতেন – মুরগী ম্লেচ্ছদের খাবার! এখনকার প্রজন্ম ভাবতে পারে এসব কথা? পরে পোল্ট্রি চলে এলো৷ ইদানীং শুকরের মাংসও ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে৷ আমার বলার বিষয় হচ্ছে খাদ্য নির্বাচনের এই বিবর্তন একটা natural process ৷ এ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আজ কেউ কি বলতে পারে?

এখন এই খাদ্য নির্বাচনের সময় আরও কিছু বিষয় বিচার্য থেকে যায়৷ সেগুলো হল বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য ঠিক থাকছে কি না, আমরা খেয়ে খেয়েই অনেক প্রজাতির পশুকে পৃথিবী থেকেই বিলোপ করে দিতে চলেছি কি না, কোন পশুর মাংস হিসাবে পেটে যাওয়ার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অন্য বিশেষ উপযোগিতা আছে কি না? ইত্যাদি বিচার করে পশুহত্যা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের৷ কারণ সরকারের হাতে  উপরোক্ত বিচার্য বিষয়গুলোর সঠিক অধ্যয়ন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য মেশিনারি আছে৷ আমাদের বাজারে আগে কচ্ছপের মাংস বিক্রি হত, আজকে তা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ৷ হরিণের মাংস, বুনো শুয়োরের মাংসের স্বাদ থেকে সরকার আমাদের বঞ্চিত করেছে৷ আমরা কিন্তু মেনে নিয়েছি৷

কিন্তু দেখা যাচ্ছে ভারতে গোহত্যার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট সহ একাধিক হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা জারী করা সত্ত্বেও তাকে সম্পূর্ণভাবে অমান্য করা হচ্ছে৷ কোনও ধর্মীয় ground এ এই নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে তা নয়৷ দুধ সরবরাহ এবং কৃষিকাজের ক্ষেত্রে আজও গরুর উপযোগিতা অনস্বীকার্য৷ তাই গরুকে সম্পদ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে গোসম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত৷ West Bengal Animal Slaughter Control Act, 1950 অনুসারে পশ্চিমবঙ্গেও প্রজননে, কৃষিকাজে সক্ষম ও ১৪ বছরের কম বয়সী গরুকে হত্যা করা নিষিদ্ধ৷ তা সত্ত্বেও বাস্তবে কি ঘটে চলেছে তা আমাদের কারো অজানা নয়৷ ধর্মের নাম দিয়ে আদালতের অবমাননা করা হচ্ছে বুক ঠুকে! ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ভারতের শিশুদের গোদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে বিনা বাধায়!

কৃষিকাজে মুসলমানরা কি গরু ব্যবহার করে না? করে৷ মুসলমান শিশুরা কি গরুর দুধ খায় না? খায়৷ গোসম্পদ সংরক্ষণ হলে কি শুধু হিন্দুদেরই লাভ হবে? নিশ্চই না৷ তা সত্ত্বেও গরু কাটার প্রতি এত আগ্রহ কেন মুসলিম সমাজের? কারণ হিন্দুদের উপরে নিজেদের সুপ্রীমেসিকে প্রতিষ্ঠিত রাখা৷ শক-হূণেরা ভারতে এসে একদেহে লীন হয়ে যেতে পারলেও পাঠান-মোগলরা পারে নি৷ কোনদিন পারবেও না৷ কারণ ইসলামের কোর্ হচ্ছে seperatism! তারা পৃথিবীর কোন দেশে গিয়ে মূল সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে নি৷ তাদের মুখে সর্বত্র একই দাবি – আলাদা স্টেটাস চাই৷ আলাদা আইন, আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা, আলাদা ভাষা, আলাদা পতাকা ……… আলাদা দেশ!

কেউ সাধারণভাবে গরু খেলে আমার কোন আপত্তি নেই৷ উত্তর পূর্বাঞ্চলের অনেক জনগোষ্ঠীর সাথে গভীর ভাবে মিশে দেখেছি তারা সবদিক দিয়ে হিন্দু হলেও গরু খায়৷ এতে তাদের হিন্দুত্ব বিন্দুমাত্র ফিকে হয়ে যায় বলে আমি মনে করি না৷ তারা এই দেশকে ভালোবাসে, দেশের অখন্ডতা রক্ষায় জীবন দেওয়াকে তারা ধর্ম মনে করে৷ তাই গরু খেলেও কিছু এসে যায় না৷ কিন্তু ভারতের বৃহত্তম হিন্দু সমাজের moral down করার উদ্দেশ্য নিয়ে, ভারতের সংবিধান ও আইনকে অপমানিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে, ভারতের বুকে বসে seperatism এর ভাবনাকে জাগিয়ে রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে গোহত্যা করার প্রবণতা মুসলমানদের ত্যাগ করা উচিত৷ 

পরিশেষে সেকু-মাকু ভাইদের কাছে বিনম্র নিবেদন, মুসলমানদের এই গোহত্যা করার আগ্রহের পিছনে motive টাকে অনুধাবন করুন৷ এদের সমর্থন করার অর্থ হচ্ছে ভারত ভাঙার চক্রান্তকে সমর্থন করা৷ এদের শক্তিবৃদ্ধি করার অর্থ হচ্ছে সেকুলারিজমকে হত্যা করা, লিবারালিজমকে ধ্বংস করা৷ রুশদী, তসলিমা, হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে সম্প্রতি নিহত মুক্তমনা ব্লগারদের পরিণতির কথা ভাবুন৷ যে কোন এলাকার সেকুলার, লিবারাল পরিবেশ সেখানকার মুসলিমদের শক্তির সাথে inversely proportional! মানলাম আপনারা শিক্ষিত, চাড্ডিরা অশিক্ষিত৷ কিন্তু মাঝনদীতে ঝড় উঠলে সেই অশিক্ষিত মাঝিই কিন্তু আপনাদের মত বিদ্যেবোঝাই বাবু মশাইদের পরিত্রাতা, সেই অশিক্ষিত চাড্ডিরা গদা হাতে না দাঁড়ালে মুক্তমনা ব্লগারদের মত আপনাদের জীবনটাও যে ষোল আনাই মিছে এটা ভুলবেন না৷

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s