ফুরফুরার ইতিবৃত্ত

আজ থেকে প্রায় সাতশ বছর আগের ঘটনা। বঙ্গদেশের অধিকাংশ তখন মুসলিম শাসনাধীন। হুগলী জেলার বালিয়া বাসন্তী তখনও মুসলমানদের দাসত্ব স্বীকার করে নি। স্বাধীনচেতা বাগদীদের রাজত্ব সেখানে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। রাজার নাম সম্ভবতঃ চন্দ্রনাথ কিংবা গোবিন্দচন্দ্র। কিন্তু মুসলিম শাসকদের চোখে তখন বিশ্বজুড়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। ইসলামের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে পৃথিবীর সর্বত্র। তাই বালিয়া বাসন্তী কীভাবে কাফেরদের অধীনে থাকতে পারে! অতএব হজরত শাহ হোসেন বুখারীর নেতৃত্বে সেনা অভিযান শুরু হল বালিয়া বাসন্তী দখলের জন্য। এই সৈন্যদলের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন হজরত মওলানা মনসুর বাগদাদী।

বালিয়া বাসন্তী আক্রমণকারী এই বাগদাদী মহাশয় হলেন ফুরফুরা শরীফের প্রাণপুরুষ দাদা হুজুর নামে পরিচিত মহম্মদ আবু বকর সিদ্দিকীর পূর্বপুরুষ। আরও পিছনের দিকে গেলে দেখা যায় যে এই দাদা হুজুর হলেন নবী হজরত মহম্মদের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিকীর বংশধর। অর্থাৎ আজকের ত্বহা সিদ্দিকী এবং আব্বাস সিদ্দিকীরা হলেন বালিয়াবাসন্তী আক্রমণকারী বাগদাদীদের উত্তরসূরি।

এখন ওদের মুখ থেকেই শোনা যাক এই হানাদারেরা কিভাবে বালিয়াবাসন্তী দখল করেছিল-

প্রাতঃকালে মোসলেম সৈন্যগণ বাগ্দী রাজার অধীনস্থ গ্রামসমূহ আক্রমণ করেন। বাগদী রাজা বহু সৈন্যসহ তাঁহাদের সম্মুখীন হন। ইহার ফলে উভয় পক্ষে ঘোরতর যুদ্ধ উপস্থিত হয়। ইহার ফলে বাগ্দী রাজার বহু সৈন্য হতাহত হয়। পরদিবস পুনরায় যুদ্ধ আরম্ভ হইল। কিন্তু বাগ্দী রাজার সৈন্য সংখ্যা মোসলেম সৈন্য সংখ্যার দ্বিগুণ দেখিয়া মোসলেম সৈন্যগণের মধ্যে শাহ সোলায়মান এবং অন্যান্য বহু বোজর্গ-সৈন্য শহীদ হইলেন। ইহাতে সেনাপতি বিষম চিন্তায় পতিত হইয়া অশ্রু বিসর্জ্জনপূর্ব্বক আল্লাহতায়ালার নিকট মোনাজাত করিতে লাগিলেন এবং ফতেহ হইবার নিমিত্ত দোয়া চাহিয়া নিদ্রাভিভূত হইলেন চিন্তিত সেনাপতি সৈয়দ হোসেন বুখারী (রহ.) নিদ্রিত অবস্থায় এক আশ্চর্য ও অভিনব স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন নিদ্রিত অবস্থায় তাঁহাকে স্বপ্নে যেন কেহ বলিতেছেন ঐ বাগ্দী রাজার বাড়ীতে জিঁয়ত কুন্ড-নামে এক পুষ্পরিণী আছে, তথায় দুষ্ট জেন প্রভৃতি বাস করে। আহত সৈন্যগণকে উহাতে নিক্ষেপ করিলে, উক্ত দুষ্ট জেনগণ উহাদের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া অসীম বলশালী করিয়া তোলে। এই নিমিত্ত উহার সৈন্যসংখ্যা হ্রাস পাইতেছে না। যদি কোনও উপায়ে উহাতে একখ- গরুর গোশত নিক্ষেপ করা যায়, তাহা হইলে উক্ত দুষ্ট জেন প্রভৃতি পলায়ন করিবে। সুতরাং উহাদের সমস্ত শক্তি বিনষ্ট হইয়া যাইবে। (ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস, হযরত মাওলানা আবু জাফর সিদ্দিকী সাহেবের লিখিত ও প্রকাশিত, তৃতীয় সংস্করণ, প্রকাশকাল-আষাঢ়, ১৩৪৩ বাংলা, পৃঃ ৪-৫)।

উক্ত নিগুঢ়-রহস্য জানতে পেরে তিনি আল্লাহপাকের দরবারে শোকর গোজারী করতে লাগলেন এবং কি উপায়ে উক্ত কাজ সমাধা করা সম্ভব হয় সে বিষয়ে চিন্তা করতে থাকেন। এমন সময় খবর পেলেন যে, উক্ত রাজা মেহমানদেরঅত্যন্ত সমাদর করেন এবং আহারাদি না করিয়ে কোনরূপেই তাঁকে বিদায় দেন না।

এই সংবাদ প্রাপ্তে তিনি পুরোহিতের বেশ ধারণ করত জপমালা হস্তে লইলেন এবং একখ- গরুর গোশ্ত প্রচ্ছন্নভাবে লইয়া এক বৃক্ষতলে বসিয়া জপ আরম্ভ করিলেন। (কারণ হাদীসে আছে الحرب خدة) বাগ্দী রাজা উক্ত পুরোহিতের সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে দাসবৃন্দকে আদেশ করিল যে, তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করত উত্তমরূপে আহারাদি করাইয়া বিদায় দাও। দাসবৃন্দ নানা উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য লইয়া পুরোহিতের নিকট গমন করিলেন এবং আহার করিবার নিমিত্তে তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি তাহাদের প্রতি ভ্রক্ষেপও করিলেন না। দাসবৃন্দ বিফল মনোরথ হইয়া রাজার নিকট প্রত্যাবর্তন করিল। রাজা স্বয়ং তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া বিনয় পূর্বক তাঁহাকে রাজবাড়ি ভ্রমণ করিয়া আহারাদি সম্পন্ন করিতে সবিশেষ অনুরোধ করিলে, পুরোহিত বেশধারী হযরত শাহ হোসেন বোখারী (রহ.) উত্তরে জানাইলেন যে, আমি বহুদিন পর্যন্ত স্নান করি নাই এবং স্নান না করিয়া আহারাদি সম্পন্ন করিতে পারিব না। অদ্য জিঁয়ত কু- পুষ্করিণীতে স্নান করিয়া আহারাদি সম্পন্ন করিলে গোনাহ সমূহ মোচন হইবে। ইহা বিধাতার আদেশ। তন্নিমিত্ত এখানে উপস্থিত হইয়াছি।তদ্শ্রবণে বাগদী রাজা অতিশয় আনন্দিত হইল। তাঁহাকে জিঁয়তকুন্ডে পুষ্করিণী দেখাইয়া তথায় স্নান করিতে অনুরোধ করিলেন এবং অন্দর মহলে প্রবেশ করিলেন। তিনি এই সুযোগে আপন উদ্দেশ্য পূর্ণ করিলেন। গোশতখ- পুষ্করিণীতে নিক্ষিপ্ত হইবা মাত্র এরূপ ভয়াবহ শব্দ উত্থিত হইল যে, রাজবাড়ির সমস্ত মানুষ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পতিত হইল। ইত্যবসরে তিনি ঐ স্থান হইতে প্রস্থান করত নিজ শিবিরে উপস্থিত হইলেন। উল্লিখিত শব্দটি আর কিছ্ই নহে, জিঁয়ত-কুন্ডে যে সকল দুষ্ট জেন প্রভৃতি ছিল, তাহারা ঐরূপ বিকট শব্দ করিয়া ঐ স্থান হইতে প্রস্থান করিয়াছিল

পরদিন সকালে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হল। উভয়পক্ষের বহু সৈন্য হতাহত হল। বাগদী রাজা আহত সৈন্যগণকে পূর্বের ন্যায় জিয়ত কুন্ডে নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু ঐদিন একজন সৈন্যও ক্ষমতাসম্পন্ন হইল না, বরং পানিতে নিমজ্জিত হইয়া মরিয়া গেলঅতঃপর মুসলমান সৈন্যগণ সহজেই যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন। বেগতিক দেখিয়া বাগ্দী রাজা অবশিষ্ট সৈন্যসহ বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর রাজার দেশের দিকে পলায়ন করিল (ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস, ৩য় সংষ্করণ, ১৩৪৩ বাংলা, পৃষ্ঠা ৫-৬)

এইভাবে প্রতারণা করে বালিয়াবাসন্তী রাজ্যে খিলাফত কায়েম করার পরে সেখানে ফুরফুরা শরীফ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই প্রসঙ্গে ‘ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস ও হজরত আবু বকর সিদ্দিকী(রহঃ) এর বিস্তারিত জীবনী’ গ্রন্থে গ্রন্থকার হজরত আল্লামা মহম্মদ রুহল আমিন(রহঃ) লিখেছেন – চারিজন মুসলমান সৈন্য পলায়নপর রাজ সৈন্যের দিকে ধাবিত হইলেন এবং কাগমারী মাঠে তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিয়া শহীদ হইয়া গেলেন। সেনাপতি এই সংবাদ শুনিয়া তাহাদের মৃতদেহ আনাইয়া বালিয়াবাসন্তীতে দফন করতঃ তদুপরি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করাইয়া দেন। তাহাদের মস্তক দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল বলিয়া উহা কাগমারী মাঠেই সমাহিত করা হইয়াছে। শত শত লোক এখনও চারি শহীদের মাজারে জিয়ারত করিয়া থাকে। বালিয়াবাসন্তীতে মুসলিম গৌরব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হইলে তথাকার নাম হজরতে ফুরফুরা শরীফ রাখা হয়। এর অর্থ এই যে ফুরফুরা শরীফ হল আরব সাম্রাজ্যবাদীদের বালিয়াবাসন্তী বিজয়ের গৌরবের প্রতীক। এখন অনেকেই এই বইয়ে যা লেখা আছে তার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। আমার কাছে এর ঐতিহাসিক সত্যতার থেকেও এই বইয়ের ভুমিকায় লেখকের একটি স্বীকারোক্তিকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে – পুস্তকের প্রত্যেকটি বিষয় পীর সাহেব কেবলার  সুযোগ্য সাহেবজাদাগণের অনুমতি ও অনুমোদন লইয়া প্রকাশিত (পৃষ্ঠাঃ ৪)।

এবারে আসুন ফুরফুরা শরীফের সাথে যার নাম বারবার উচ্চারিত হয় সেই দাদা হুজুর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকি ১৮৪৫ সালে ফুরফুরা শরীফে পিতা আব্দুল মুক্তাদির সিদ্দিকীর ঘরে জন্ম গ্ৰহণ করেন। ইনি ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকির সরাসরি বংশধর এবং সবার কাছে দাদা হুজুর পীর কেবলা নামে পরিচিত।

পশ্চিমবঙ্গগ, বাংলাদেশ, আসাম ও অন্য আরও অনেক স্থানে তাঁর খলিফাগণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তাদের মোট সংখ্যা ছিল ৫৭০ জন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ১১০০ মাদরাসা এবং ৭০০ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ‘জমিয়তে উলেমা’ নামের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এবারে পীর সাহেবের চিন্তাধারা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাক।

খিলাফত আন্দোলন চলাকলীন একবার গান্ধীজী মওলানা সওকত আলি, মহম্মদ আলি প্রমুখ কয়েকজন মুসলমান সহ টিকাটুলি মসজিদে পীর সাহেবের সাথে দেখা করেন এবং তাকে কংগ্রেসে যোগদান করতে অনুরোধ করেন। জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি কোরান-হাদিসের পক্ষপাতী। কংগ্রেস য়দি ভারতে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য এবং ইসলামের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয় তবে কংগ্রেসে যোগ দিতে তার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু কংগ্রেস এর মধ্যে কোনও একটির বিরোধিতা করলে আর তার কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা পাবে না। পরে গান্ধীজীর অনুপস্থিতিতে পীর সাহেব মওলানা মহম্মদ আলীকে জানিয়ে দেন যে কংগ্রেসের উপরে তার আস্থা নেই। তিনি বলেন আমাদের কাছে আগে দ্বীন, পরে দেশ। দ্বীন ছেড়ে দিয়ে দেশের উদ্ধার আমাদের অভিপ্রেত নয়(ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস ও হজরত আবু বকর সিদ্দিকী-এর বিস্তারিত জীবনীঃ পৃষ্ঠা- ৫৮)।

১৯৩০ সালের ১লা এপ্রিল বৃটিশ ভারতে বাল্যবিবাহ নিরোধক আইন কার্যকর হয়। এই আইনকে সারদা আইনও বলা হত। পীর সাহেব বলেন এই আইন মুসলমানদের কোরান ও হাদীসের পরিপন্থী। কারণ কোরানে বাল্যবিবাহের অনুমোদন আছে। স্বয়ং নবী হজরত মহম্মদ নাবালিকা আয়েশাকে বিবাহ করেছিলেন। তাই এই সারদা আইনের প্রতিবাদে পীর সাহেব মনুমেন্টের নিচে একটি বিশাল জমায়েতের আয়োজন করেন এবং বলেন এই আইনের দ্বারা মুসলমানদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মুসলমানদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে- জেহাদ অথবা হিজরত। শুধু সভা করেই তিনি ক্ষান্ত হন নি। তিনি নিজে এই আইন ভেঙে একজন নাবালিকার বিয়েও দেন।

পীর সাহেব সহি ইসলামি রীতিনীতির সাথে কোনও রকম আপোষ করতেন না। একবার উত্তরপাড়ায় একটি সভায় গিয়েছিলেন। সমবেত হিন্দু জনতা তাকে বন্দেমাতরম ধ্বনিতে স্বাগত জানালে তিনি গাড়ির উপর থেকে ‘চোপরও’ বলে হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন। জনতা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের পাশে হিন্দুদের একটি প্রস্তরমূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন এই পীর সাহেব। ফলস্বরূপ এই মূর্তি আর বসানো সম্ভব হয় নি।

কলকাতার টালায় একটি অস্থায়ী মসজিদ ছিল। সেখানে মুসলমানরা গরু জবাই করার চেষ্টা করলে স্থানীয় হিন্দুরা বাধা দেয় এবং মসজিদটির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতের শরণাপন্ন হয়। মুসলমানরা তাড়াতাড়ি ওই মসজিদের বিল্ডিং পাকা করার কাজ শুরু করে। আদালত থেকে ইনজাংশন জারী হওয়ার পরেও জোর করে এই নির্মাণকাজ চলতে থাকলে অবশেষে সেনা নামানো হয়। এই পরিস্থিতিতে এই হজরত পীর সাহেবের নির্দেশে সুরাবর্দী এবং হাজী মুসা শেঠ এগিয়ে আসেন। মুসা শেঠের আর্থিক সহায়তায় এবং সুরাবর্দীর ইঙ্গিতে কয়েক হাজার মুসলমান জমায়েত হয়ে রাতারাতি পাকা মসজিদ তৈরি করে ফেলে।

পোড়াদহ নামের একটি জায়গায় জনৈক সুফি সুলেমানের বাড়িতে ইসালে সওয়াব অনুষ্ঠানে গরু কাটার পরিকল্পনা করা হয়। স্থানীয় হিন্দুরা বাধা দিলে এই হজরত পীর সাহেব নিজে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। ফলে কয়েক হাজার মুসলমান সেখানে জমায়েত হয়। এই ভীড় দেখে হিন্দুরা পিছিয়ে যায় এবং নির্বিঘ্নে সেখানে গরু জবাই করা হয়।

তিনি মুসলিম লীগের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আল্লাহ ও রসুলের আদেশে মুসলিম লীগ মুসলমানদের একতাসূত্রে আবদ্ধ করার কাজ করছিল বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। বহুবার কৃষক প্রজাপার্টি এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তিনি ফতোয়া জারী করেছিলেন।

বৃদ্ধাবস্থায় পীর সাহেব একটি অসিয়ত বা উইল করে গিয়েছিলেন। সেই অসিয়তে তার ভক্তদের জন্য কিছু নির্দেশাবলী তিনি লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তার মধ্য থেকে কয়েকটি নির্দেশের উল্লেখ এখানে করা দরকার-

১১) হিন্দুদের পূজা পার্বনে, মেলা, তেওহার, গান-বাজনার স্থানে সাহায্য করবেন না এবং সেখানে যাবেন না। পূজায় পাঁঠা, কলা, ইক্ষু, দুধ ইত্যাদি বিক্রয় করবেন না। ভেট দেবেন না, দিলে গুনাহ হবে।

৫১) কেউ শেরেক গুনাহ করবেন না। যেমন হিন্দুর পূজায় ভেট দেওয়া, পাঁঠা, কলা, দুধ বিক্রি করা….. কেউ ধান-চাউলকে মা লক্ষ্ণী বলবে না।

৫২) অমুসলমানদের তৈরি মিষ্টান্ন ইত্যাদি না খাওয়া ভাল। কারণ তাদের কাছে যা হালাল, আমাদের কাছে সেগুলো হারাম।

‘ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস ও হজরত আবু বকর সিদ্দিকী(রহঃ) এর বিস্তারিত জীবনী’ গ্রন্থে গ্রন্থকারের বর্ণনা অনুযায়ী হজরত পীর সাহেব পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মুসলমানরা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। দেশের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গায় মুসলমানদের জন্য অর্থ সাহায্য পাঠাতেন। মসজিদ অথবা কবরস্থান নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি ‘প্রধান সেনাপতি রূপে সাহায্য করিয়া মুসলমানদিগের জাতীয় সহানুভুতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিলেন’।

একবার কোনও একটি পরিস্থিতিতে একজন ইংরেজ সাহেব রায় দিয়েছিলেন যে দুটি বড় মসজিদের সামনে গান-বাজনা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে কিন্তু ছোট ছোট মসজিদের সামনে নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময়ে গান বাজনা চলতে পারে। প্রত্যুত্তরে পীর সাহেব বলেছিলেন যে আল্লাহতালার কাছে বড় মসজিদ আর ছোট মসজিদের পার্থক্য নেই। তাই কোনও মসজিদের সামনেই গান-বজনার অনুমতি থাকা উচিত নয়।

ফুরফুরা শরীফ সম্পর্কে কিছু তথ্য সকলের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। এই তথ্য আমার মনগড়া নয়। প্রত্যেকটি তথ্যের রেফারেন্স আছে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে ফুরফুরা শরীফের দর্শন এবং লক্ষ্য সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার দায়িত্ব পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি। তবে একটা কথা না বললেই নয়। সেটা হল আজকে আব্বাস সিদ্দিকী দলিত-মুসলিম ঐক্যের যে ভেক ধরেছে, সেটা বালিয়াবাসন্তী দখলের সময়ে তারা যে ছল-চাতুড়ির আশ্রয় নিয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি। তাদের ইতিহাস প্রমাণ করে যে তারাই আসলে দলিতদের প্রকৃত দলনকারী। তাই সাধু সাবধান।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s