ভগবান ভন্ডের নয়, ভগবান ভক্তের

পরিত্রাণায় সাধুনাম্ বিনাশায়চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।

উনি আসবেন যুগে যুগে। কিন্তু এসে কী করবেন? সাধুদের পরিত্রাণ করবেন এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করবেন। নিশ্চই ভাবছেন, তাহলে তো উনি আমাদের রক্ষা করার জন্য লড়াই করবেন। আমরা তাঁর ভক্ত। তাহলে উনি কি আমাদের রক্ষা করবেন না? কিন্তু আমরা কি ভেবেছি যে কেন উনি আমাদের রক্ষা করতে আসবেন? আমরা কি আদৌ সাধু? স্বার্থপরতা, ভীরুতা, কাপুরুষতা, পরনির্ভরশীলতা, স্বাভিমানহীনতা, অন্যায়ের সাথে আপোষকামিতা, অপরাধের সামনে নীরবতা-নিষ্ক্রিয়তা, স্বজন-স্বজাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা- এই সম্বল করে আমরা নিজেদের সাধু মনে করি? আসলে আমরাই তো দুষ্কৃতী! আমাদের ভাগ্য ভালো যে ভগবান আসেন নি। উনি এলে সর্বপ্রথমে আমাদের ধ্বংস করবেন। কারণ উনি দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার উদ্দেশ্যেই আসবেন।

আমাদের এই বঙ্গে আমরা কম কীর্তন করেছি? অষ্টপ্রহর, চব্বিশ প্রহর কত কি করেছি? উনি কি বাঁচিয়েছেন আমাদের? কত অত্যাচার, কত অপমান আমরা সহ্য করছি প্রতিদিন! কত ভক্তকে কোতল করা হয়েছে! কত ভক্তকে ধর্ষণ করা হয়েছে! কত কৃষ্ণমন্দির ভাঙা হয়েছে! কত ভক্তের হাত থেকে শালগ্রাম শিলা কেড়ে নিয়ে সেই হাতে আসমানী কিতাব ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে! এসেছেন উনি তাদের রক্ষা করতে? আসেন নি। বরং আমি মনে করি আমাদের সাথে যা যা হয়েছে এবং হচ্ছে, তা ভগবানের ইচ্ছাতেই হচ্ছে। যারা ভগবানের নাম-কীর্তন ভাঙতে এসেছে, মন্দির ভাঙতে এসেছে, ভক্তের কাছ থেকে ভগবানকে কেড়ে নিতে এসেছে, ভক্তদের উপরে অকথ্য অত্যাচার করেছে, মুখোমুখি রুখে দাঁড়িয়ে তাদের মাথা ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে আমরা কাঁদতে কাঁদতে পালিয়ে এসেছি। যদি এক ভক্তের বিপদে আরেক ভক্ত না দাঁড়ায়, তবে সেই ভক্তদের প্রতি কি ভগবান প্রসন্ন হতে পারেন? তাই আমাদের আর ভগবানের নাম-কীর্তন করার অধিকার নেই। পালিয়ে এসে যতই নাম-কীর্তন করি না কেন, ভগবান সেই নাম শোনেন না কারণ কাপুরুষের মুখে কৃষ্ণনাম মানায় না। ভগবানের প্রিয় হতে হলে পরাক্রমী অর্জুন হতে হয়, সাক্ষাৎ মৃত্যুর সামনেও আপোষহীন অবিচল ভক্ত প্রহ্লাদ হতে হয়। আমরা ভক্তির নামে যে ভন্ডামি করে চলেছি তাতে আশীর্বাদ নয়, বরং তার শাস্তিই ভগবান আমাদের দিয়ে চলেছেন।

আর যদি আমরা সাধু হই, তাহলেও কি উনি আমাদের জন্য লড়াই করবেন? যদি তাই হয়, তাহলে কুরুক্ষেত্রের মহারণে উনি পান্ডবদের হয়ে নিজে অস্ত্রধারণ করে কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন না কেন? কেনই বা অর্জুনকে ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী স্বজনবিনাশী সেই যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন? কেন অভিমন্যুকে রক্ষা করলেন না? কেন ঘটোৎকচের প্রাণ গেল? আসলে কৃষ্ণরূপে ভগবান আমাদের আমাদের যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন তা হল নিজের লড়াই সর্বদা নিজেদেরই লড়তে হয় এবং এই লড়াইয়ে হারজিতের বাজি নিজের উপরেই ধরতে হয়- হতো বা প্রাপ্স্যতি স্বর্গং, জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্। অন্যের উপরে বাজি ধরে আত্মপ্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় না। আমরা আত্মসম্মান চাই, আত্মপ্রতিষ্ঠা চাই, নিরাপত্তা চাই কিন্তু তারজন্য আমরা নিজেদের বাজি ধরতে রাজী নই, আমাদের বাজি হল পুলিশ, নেতা, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি। কেউ আমার বাড়ি পুডিয়ে দিতে এলে পুলিশ বাঁচাবে। কেউ আমার মেয়েকে টেনে নিয়ে গেলে পুলিশ বাঁচাবে। কেউ জোর করে আমার জমি কেড়ে নিলে পুলিশ বাঁচাবে। পুলিশের অসাধ্য হলে সেনা আসবে! আমরা শুধু প্রশ্ন করবো আর অভিযোগের আঙুল তুলবো। এইভাবে সব দায়িত্ব যদি নেতা-পার্টি-পুলিশ-সেনার উপরে ঠেলে দেওয়া হয়, স্বাভাবিকভাবেই সব অধিকারও তাদেরই হাতে চলে যায়। সব দায় ওদের আর সব অধিকার আপনার- এটা হতে পারে না। আমাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের লড়াই নিজে লড়েছেন এবং কংস-শিশুপালদের নিজের হাতে বধ করেছেন। কিন্তু অর্জুনদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে দাঁড়িয়ে অর্জুনদের বলেছেন মৃত্যুভয় ত্যাগ করো। এই যুদ্ধে আমি অস্ত্রধারণ করবো না। নিজেদের লড়াই তোমরা নিজেরাই লড়ো-

অজো নিত্যঃ শাশ্বতঃ অয়ং পুরোণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।
অর্থাৎ, আত্মা শাশ্বত, তার জন্ম-মৃত্যু নেই। আমরা মরি না, কেবলমাত্র এই ক্ষণস্থায়ী শরীরের‌ই মৃত্যু হয়।

আর বলেছেন-
হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষসে মহীম্
তস্মাৎ উত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়।।
অর্থাৎ, অধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মনস্থির করো। প্রাণ গেলে স্বর্গ, জিতলে পৃথিবী।

পরিশেষে স্পষ্টভাষায় বলে গেছেন যুদ্ধজয়ের শর্ত কি-
যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতিঃ ধ্রুবানীনির্মতির্মম।।

অর্থাৎ
একা কৃষ্ণে জয় নাই
সাথে ধনুর্ধারী পার্থ চাই।

আসুন নিজেদের লড়াই নিজেরাই লড়ি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আশির্বাদে ধর্মের জয় হবেই।

এই আন্দোলন শুধুমাত্র মন্দির মুক্ত করার আন্দোলন নয়, এই আন্দোলন বাঙ্গালী হিন্দুর অস্তিত্ব রক্ষার নির্ণায়ক লড়াই।

গত ৫ই আগস্ট রামজন্মভূমিতে বহু আকাঙ্ক্ষিত মন্দিরের ভূমিপূজন সম্পন্ন হল। যথারীতি আমাদের রাজ্যে শোরগোল শুরু হলেও এক্ষেত্রে হল যথেষ্ট পা-মেপে। কয়েকটা ফাঁপা ন্যারেটিভ চালানোর চেষ্টা হলেও সেগুলো যে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অচল, সেটা খুব তাড়াতাড়ি বুঝে নিয়ে সবাই যে যার ঘরে ঢুকে গিয়েছে। রামের বিপক্ষে বেশী কিছু বললে পায়ের তলার মাটি সরে যাবে, সেকথা বুঝে তিনিও মৌনব্রত অবলম্বন করলেন, যিনি একসময় শ্রীরামের নাম শুনলেই গাড়ি থেকে নেমে লোকজনকে তাড়া করতেন। একদা শ্রীরামের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনেক তথাকথিত সেকুলারকে বলতে শোনা গেল, “আমরাও রামকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু…..”।

আদিনাথ মন্দির

আমার দৃষ্টিতে রামমন্দির আন্দোলন কখনোই একটা মন্দির তৈরির লড়াই ছিল না। মন্দির তো একটা প্রতীক মাত্র! আসল লড়াই তো এই মাটির মালিকানা আদায়ের লড়াই, আইনের ভাষায় টাইটেল স্যুট। সোজা কথায় ভারত হিন্দুদের দেশ, এই দেশের উপরে একমাত্র হিন্দুদেরই অধিকার, বাকিরা অতিথি। ঘুরিয়ে বললে যারা ভারতের মাটির প্রতি অনুগত, ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তারাই হিন্দু এবং এই দেশের মালিক একমাত্র তারাই। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পরে এই সত্যটা আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ ধান্দাবাজ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ভন্ড ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং ভীতু সামাজিক নেতৃত্ব এই সত্যকে যতই অস্বীকার করুক এবং চেপে রাখার চেষ্টা করুক, সত্য সর্বদা সত্যই থাকে। রামজন্মভূমি আন্দোলনের পিছনে হিন্দুদের বিপুল মাত্রায় সমর্থনের কারণই হল এই যে, হিন্দুরা এই সত্যটাকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে। ১৯৪৭ সালে রাজনৈতিক স্বাধীনতালাভ এবং ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ার পরেও এই দেশে হিন্দুরা যে যথার্থ স্বাধীনতা পায় নি তার অনুভব সাধারণ হিন্দুরা প্রতি মুহুর্তে করে থাকে। যে দেশে হিন্দুরা স্কুলে রামায়ণ-মহাভারত পড়ানোর অধিকার পায় না, অথচ তথাকথিত সংখ্যালঘুরা নিজেদের জন্য স্কুল তৈরি করার এবং সেখানে কোরাণ-বাইবেল পড়ানোর অধিকার পায়- সেদেশে হিন্দুরা কি সত্যিই স্বাধীন? যেদেশে মুসলমানরা প্রতি সপ্তাহে ধর্মের নামে রাজপথ দখল করে জনজীবন অচল করে রাখার অধিকার পায়, অথচ হিন্দুদের দুর্গাপূজা করার অনুমতির জন্য আইনের মারপ্যাঁচের লম্মুখীন হতে হয়, এমনকি প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়- সেদেশে হিন্দুরা কি সত্যিই স্বাধীন? যেদেশে মুসলিম পারসোনাল ল-এর সুবাদে একটা ১৫ বছরের নাবালিকা হিন্দু মেয়েকে ছলে-বলে-কৌশলে ধর্মান্তরিত করে অনায়াসে বাল্যবিবাহ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটা মুসলিম ছেলের সাথে বিয়ে দিতে পারে অথচ হিন্দুরা ভারতের বর্তমান আইনকে মান্যতা দিয়েও বাড়ির নাবালিকা মেয়েটির রোধ করতে পারে না- সেদেশে হিন্দুরা কি সত্যিই স্বাধীন? যেদেশে সমস্ত নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর অধিকার মুসলমান-খ্রীষ্টানের পরে- সেদেশে হিন্দুরা কি সত্যিই স্বাধীন? যেদেশে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রী রামচন্দ্রের জন্মস্থানকে বিদেশী হানাদারদের দখলদারী থেকে মুক্ত করার জন্য আন্দোলন করতে হয়, গুলি খেতে হয়, প্রাণ দিতে হয়- সেদেশে হিন্দুরা কি সত্যিই স্বাধীন? যেদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর হাজার হাজার মন্দির ভেঙে তৈরি করা মসজিদগুলো আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন বিজাতীয় আক্রমণকারীদের জয়ঘোষ করে- সেদেশে হিন্দুরা কি সত্যিই স্বাধীন? এই প্রশ্ন কিন্তু প্রতিটি সাধারণ হিন্দুর মনে আজ দানা বেঁধেছে।

শৃঙ্খলাদেবী মন্দির

বস্তুত সেকুলারিজমের নামে ভারতে হিন্দুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে রাখা হয়েছে, এই সত্য আজ একটি ওপেন সিক্রেট। হিন্দুরা আর এই অন্যায় সহ্য করতে রাজী নয়। তারা এই মাটির উপরে আরবদালালদের কর্তৃত্ব কখনোই স্বীকার করতে রাজী নয়। তারা এই মাটির উপরে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে-মারতে-মরতে প্রস্তুত। তাই এই লড়াই মন্দির বানানোর লড়াই নয়, এই লড়াই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই। এই লড়াই এই মাটির উপরে হিন্দুর মালিকানা প্রতিষ্ঠার লড়াই। রামমন্দিরের ভূমিপূজন হওয়ার পরে মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড অফিসিয়াল টুইটার হ্যান্ডেল থেকে ঘোষণা করেছে তারা ওই স্থানে আবার বাবরি মসজিদ ফিরে পেতে চায়। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা বলেছেন ওখানে বাবরি মসজিদই আছে, থাকবে। এই সব বিবৃতি প্রমাণ করে যে বাবরের বংশধররা আজও ভারতের আইন-শাসন মানতে রাজী নয় এবং এই মাটিকে দখল করে আবার মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন তারা আজও দেখে। তাই এই টাইটেল স্যুটের লড়াই হিন্দুদের এখনও লড়তে হবে। আর এই লড়াই তখনই শেষ হবে যখন এই মাটির উপরে বাবরের বংশধরদের সামান্যতম দখলদারীও আমরা কেড়ে নিতে পারবো। সম্প্রতি মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমিকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে কৃষ্ণজন্মভূমি ন্যাস তৈরী হয়েছে। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বিদেশী আক্রমণকারীদের হাতে ধ্বংস হওয়া অগণিত হিন্দুর শ্রদ্ধাকেন্দ্র পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে এই বঙ্গের মাটির উপরে বাঙ্গালী হিন্দুর মানিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হিন্দু সংহতি আপাতত মালদহের আদিনাথের মন্দির, যা আদিনা মসজিদ নামে পরিচিত, হুগলি জেলার ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম শৃঙ্খলাদেবীর মন্দির যা পান্ডুয়া মিনার নামে পরিচিত এবং ত্রিবেণী সঙ্গমে অবস্থিত বিষ্ণু মন্দির যা জাফর শাহ গাজীর দরগা নামে পরিচিত-এই কয়টি হিন্দুর মন্দির পুণরুদ্ধারের জন্য আন্দোলনে নামার কথা ঘোষণা করেছে। এই আন্দোলন শুধুমাত্র মন্দির মুক্ত করার আন্দোলন নয়, এই আন্দোলন বাঙ্গালী হিন্দুর অস্তিত্ব রক্ষার নির্ণায়ক লড়াই।

ত্রিবেণী বিষ্ণুমন্দির

সিদ্ধান্ত নিলাম, কম্যুনালদের মত কথা আর কখনও বলব না!!!

না আর কম্যুনালদের মত কথা বলবো না৷ মুক্তমনারাই ঠিক৷ লিবারাল ভাবনার থেকে উচ্চ আদর্শ আর নাই৷ তাই সিদ্ধান্ত নিলাম কম্যুনালদের মত কথা আর কখনও বলব না৷

দাঙ্গাবাজ মোদী সরকারের কাছে একজন সদ্য লিবারাল হিসেবে একটা সেকুলার দাবী রাখতেই এই পোস্ট৷ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প দিক্ বিদিক ছেয়ে ফেলেছে৷ তাই মোদী সাহেবের কাছে নিবেদন, সমস্ত সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সমূলে বিনষ্ট করুন৷ না, শুধু গোল গোল কথা বলেই নিজের দায়িত্ব শেষ করবো না৷ কিছু লিবারাল প্রস্তাবও আপনার সামনে রাখবো৷

১) ধর্মের উল্টোপাল্টা নির্দেশগুলোই সমস্ত গোলমালের মূল৷ তাই ভারতে যত ধর্মমত প্রচলিত আছে, সবগুলির গভীর অধ্যয়ন করা হোক৷ যে যে ধর্মমত অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের প্রতি অসহিষ্ণু হতে শিক্ষা দেয়, অন্য ধর্মকে অপমান করার শিক্ষা দেয়, অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়, অন্য ধর্মের প্রতি বিশ্বাসকে এবং শ্রদ্ধাকে আঘাত করার নির্দেশ দেয় – সেই সেই ধর্মমতের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক৷ কারণ, উদারতার পীঠস্থান এই ভারতের মাটিতে অসহিষ্ণুতার কোন স্থান নাই৷

২) ধর্মের ভিত্তিতে দেশের মানুষকে বিভক্ত করা বন্ধ করুন৷ তার জন্য ধর্মের ভিত্ততে সব রকম সংরক্ষণ বাতিল করুন৷ ধর্মের ভিত্তিতে সমস্ত সরকারী সুযোগ সুবিধা দেওয়া বন্ধ করুন৷

 ৩) ধর্মীয় সংখ্যালঘু শব্দটাকে ব্যান্ করুন৷ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য যতগুলো সরকারী প্রকল্প আছে, সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা হোক৷

৪) সংবিধান থেকে ৩০এ ধারাটি তুলে দিন৷ এই ধারার বলে শিক্ষার মত পবিত্র ক্ষেত্রকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করা হচ্ছে৷

৫) ধর্মের ভিত্তিতে দেশের নাগরিকদের জন্য আলাদা আইন বাতিল করে সবার জন্য সমান আইন বলবৎ করুন৷

যাত্তেরী!!!! লিবারাল হতে গিয়ে দেখছি ঘোর কম্যুনাল কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছি! নাঃ, আর কথা বাড়ালে কম্যুনালই থেকে যাবো৷ লিবারাল আর হওয়া যাবে না৷ তাই শেষ করছি৷ সেকুলার আর লিবারালরা ক্ষমা করবেন৷ কারণ আমি এখন কনফিউসড হয়ে পড়ছি – কম্যুনালরাই আসল লিবারাল, না কি লিবারালরাই আসল কম্যুনাল!

হিন্দুত্বকে আমি আমার জাতীয়তা বা Nationality বলে মনে করি

হিন্দুত্বকে আমি আমার জাতীয়তা বা Nationality বলে মনে করি৷ আমার মতে ভারতীয় ও হিন্দু শব্দ সমার্থক৷ কিন্তু ভারতীয় শব্দটার বদলে আমি হিন্দু শব্দটা এই কারণেই ব্যবহার করার পক্ষে যে, সেকু-মাকুরা ভারতীয় শব্দটার প্রকৃত অর্থটাকে কলুষিত করে দিয়েছে৷ আজ ভারতীয় বলতে কাগজে কলমে যারা ভারতের নাগরিক, তাদের সকলকেই বোঝায়৷ পাকিস্তানের পতাকা তুললেও তারা ভারতীয়৷ বন্দেমাতরম বলতে অস্বীকার করলেও তারা ভারতীয়৷ জামাত, আইসিসের দালাল হলেও তারা ভারতীয়৷ আবার রাশিয়া-চিনের দালালি করলেও তারা ভারতীয়৷ মাদ্রাসায় তিরঙ্গা তুলতে রাজী না হলেও তারা ভারতীয়, আবার ঈদের দিন স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি ঢেকে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তারা ভারতীয়, রামকে অস্বীকার করে বিদেশী আক্ররমণকারী বাবরের স্মৃতিচিহ্ন বাবরি মসজিদের জন্য আবদার করলেও ভারতীয়৷ ভারতে থেকে, ভারতের খেয়ে ভারতের মূল স্রোত থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখলেও, ভরতের আইন মানতে অস্বীকার করলেও তারা ভারতীয়! তাই ভারতীয় শব্দটা আজ আর সঠিকভাবে ভারতীয় ভাবটার দ্যোতক হতে পারছে না৷ আর এই শব্দটাকে ব্যবহার করে দেশের শত্রুদেরকেও প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, দেশপ্রেমী নাগরিকদেরকে বিভ্রান্ত করে ভারতের শত্রুদেরকে চিনতে দেওয়া হচ্ছে না৷

তাই হিন্দু শব্দটাই প্রকৃত অর্থে ভারতীয়ত্বকে প্রতিফলিত করে বলে আমি মনে করি৷ এর সাথে উপাসনা পদ্ধতির কোন সম্পর্ক নেই৷ একজন আমেরিকার প্রকৃত নাগরিক যদি নিজেকে আমেরিকান বলতে গর্ব অনুভব করে, বৃটেনের একজন প্রকৃত নাগরিক যদি নিজেকে বৃটিশ বলতে গর্ব অনুভব করে, আমি হিন্দুস্থানের দেশভক্ত নাগরিক হিসেবে নিজেকে হিন্দু বলতে গর্বিত হব না কেন? সেকু-মাকুরা সাম্প্রদায়িক বলবে বলে?

ভারতের আইনও সেই ভগবানের মত

দুই ভাই ছিল৷ বড় ভাই ধর্মভীরু, দেব-দ্বিজে চরম ভক্তি৷ এদিকে ছোট ভাই ততটাই নাস্তিক৷ একদিন ঘটনাচক্রে দুই ভাই বাড়ি থেকে অনেক দূরে এমন এক জায়গায় আটকে গেল, যেখান থেকে সেই রাতে বাড়ি ফেরার কোন ব্যবস্থা নেই৷ অগত্যা কি করা যায়! দুজনে মিলে রাত কাটানোর একটা আস্তানা খুঁজতে লাগলো৷ অনেক খোঁজাখুঁজির পরে একটা মন্দিরের সন্ধান পাওয়া গেল, যেখানে সেই রাতটা কাটানো যায়৷ রাতে খাওয়া দাওয়ার পর দুই ভাই শুয়ে পড়লো৷ বড় ভাই ভক্তি ভরে দেবমূর্তিকে প্রণাম করে, ভগবানের পায়ের কাছে মাথা রেখে শু’লো৷ এদিকে নাস্তিক ছোট ভাই দাদাকে একটু চুলকে দেওয়ার জন্য একেবারে দেবমূর্তির গায়ে পা তুলে শু’লো৷ বড় ভাই অনেক বুঝানোর চেষ্টা করে বিফল হয়ে অবশেষে একরাশ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়লো৷

মাঝরাতে হঠাৎ ভগবান বড় ভাইয়ের স্বপ্নে আবির্ভূত হলেন৷ বললেন, ‘ভাইকে পা নামিয়ে শুতে বল্, না হলে বিপদ হয়ে যাবে কিন্তু!’ বড় ভাই ধরমড় করে উঠে ছোট ভাইকে ঘুম থেকে তুলে স্বপ্নের কথা বলল৷ কিন্তু কে কার কথা শোনে! ছোট ভাই আরো জুতসই করে মূর্তির গায়ে পা রেখে ঘুমাতে লাগল৷ কিছুক্ষণ পরেই আবার সেই স্বপ্ন৷ এবার রীতিমত হুমকি! তাড়াতাড়ি জেগে উঠে ছোট ভাইয়ের ঘুম ভাঙাতেই বিরক্ত হয়ে সে বলল,’ এবার ভগবান দেখা দিলে আমার সাথে সরাসরি কথা বলতে বলবি৷ অন্যায় যদি হয়, সেটাতো আমি করছি! তোর ভগবান আমাকে না বলে তোর উপরে চোটপাট করছে কেন?’

এবার স্বপ্নে দেখা দিলে বড় ভাই ভগবানকে সেই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ভগবান অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন,’ তুই আমাকে মানিস বলেই তো তোকে বলতে পারছি৷ ও তো আমাকে মানেই না! ওকে বললে ও কি মানবে আমার কথা? তাই ওকে বলে লাভ কি?’

ভারতের আইনও এই ভগবানের মত৷ যে মানে, তার উপরেই যত চোটপাট! যে মানে না, তাকে কিছু বলার হিম্মত নেই! তাই আজকে মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ড, সিদ্দিকুল্লার মত লোকেরা সুপ্রিম কোর্টের জাজমেন্টের পরেও ঘোষণা করতে পারে- রামজন্মভূমি মানি না, বাবরি মসজিদই থাকবে।

বঙ্গ, বাঙ্গালী এবং রামায়ণ (২)

রাম বহিরাগত, তার সাথে বাঙ্গালীর কী সম্পর্ক! এই বাংলায় রামের কোনও স্থান নেই – এই ধরণের কথাবার্তা বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সুকৌশলে। উদ্দেশ্য বাঙ্গালীকে বিভ্রান্ত করা, বৃহত্তর হিন্দু সমাজ থেকে এবং ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। এইভাবে অবশেষে বাঙ্গালীকে এবং আমাদের এই অবশিষ্ট বঙ্গভূমিকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে গ্রেটার বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা। এইভাবে ধীরে ধীরে আমাদের বাঙ্গালী আইডেনটিটিকে হাইজ্যাক করে বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বাটাকেই ধ্বংস করে দেওয়ার একটা গভীর চক্রান্ত চলছে। এটাকে প্রতিহত করতে হলে শুধুমাত্র জয় শ্রীরাম বলে স্লোগান দিলেই হবে না, যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে সত্যকে সকলের সামনে তুলে ধরতে হবে। এই তথ্য ষড়যন্ত্রীদের জন্য নয়, এগুলো মুক্তমনা যুক্তিবাদী বাঙ্গালী যুবসমাজের জন্য, যারা প্রকৃত সত্য জানতে এবং মানতে আগ্রহী। আসুন একটু তথ্যভিত্তিক আলোচনা করা যাক বঙ্গ এবং বাঙ্গালীর সাথে রামের সম্পর্ক আদৌ কতটা।

এই বঙ্গদেশে খ্রীষ্টিয় ষষ্ঠ শতকে (গুপ্তযুগে) গৌড়ীয় রামায়ণ রচিত হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য যে এই গৌড়ীয় রামায়ণই প্রথম ভারত থেকে ইউরোপে প্রেরিত হয়েছিল বলে জানা যায়। জার্মানির বন থেকে ১৮২৯-৩৮ খ্রীষ্টাব্দে এই গ্রন্থটি দুটি খন্ড প্রকাশিত হয়।

সম্পর্কিত বিযয়ঃ বঙ্গ, বাঙ্গালী এবং রামায়ণ (১)

খ্রীষ্টিয় নবম শতকে দেবপালের সময় গৌড় অভিনন্দ কর্তৃক রচিত হয় রামচরিত এবং খ্রীষ্টিয় দশম শতকে পালযুগেই মুরারী মিশ্র রচনা করেন অনর্ঘ রাঘব নামে একটি কাব্য-নাটক। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে মঞ্চস্থ করার জন্য এই কাব্য-নাটকটি রচিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এতে রামায়ণের বালকান্ড থেকে যুদ্ধকান্ড পর্যন্ত আছে। পরবর্তীকালে খ্রীষ্টিয় একাদশ শতকে রামপালের সময় সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিত বিশেষভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। এছাড়াও খ্রীষ্টিয় দ্বাদশ শতকে জনৈক কবি জয়দেব কর্তৃক রচিত হয় প্রসন্ন রাঘব। ইনি পীযূষবর্ষ উপাধি লাভ করেছিলেন।

১১৭৯ সালের আশেপাশে লক্ষ্ণণ সেনের সভাকবি এবং পঞ্চরত্নের এক রত্ন গোবর্ধন আচার্য্য আর্যা সপ্তশতী নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। শ্রী জাহ্নবী কুমার চক্রবর্তী এই প্রসঙ্গে বলেছেন, আর্যা সপ্তশতীর রামায়ণীয় প্রসঙ্গগুলিতে বাঙ্গালীর রামায়ণ চর্চার বৈশিষ্ট্যগুলি সুপরিস্ফুট। রামায়ণ চর্চায় বাংলাদেশ কোথাও সর্বাংশে বাল্মীকি রামায়ণের অন্ধ অনুকরণ করে নাই।ইহার বহু উপাদান অধ্যাত্ম রামায়ণ, পুরাণ বা লোকশ্রুতি হইতে সমাহৃত।…… দ্বিতীয়ত, গঙ্গা ঐরাবতকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিলেন এপ্রসঙ্গও বাল্মীকি রামায়ণে নাই। অধ্যাত্ম রামায়ণেও নাই। অথচ ইহা অতি সুপরিচিত কাহিনী। খুব সম্ভব কোন পুরাণ অথবা লোককাহিনী হইতে ইহা সংগৃহীত। আর্যার কাহিনী বাঙ্গালীর সংস্কার বিশ্বাসকেই অনুসরণ করিয়াছে।(আর্যা সপ্তশতী ও গৌড়বঙ্গ; রামায়ণ: প্রথম প্রকাশ ১৩৭৮, পৃষ্ঠা- ৮০)

১২০৬ খ্রীষ্টাব্দে সদুক্তি কর্ণামৃত গ্রন্থখানি সংকলন করেন লক্ষ্ণণ সেনের একজন সামন্ত শ্রী বটুদাসের পুত্র শ্রীধর দাস। এর পাঁচটি প্রবাহের মধ্যে দেবপ্রবাহে শ্রীরাম এবং বিরহী শ্রীরাম নামে দুটি কবিতা আছে। ১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দে সাগর নন্দী নামে একজন নাটক লক্ষ্মণ রত্নকোষ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙ্গালী নাট্যকারের রচিত নাটকের উল্লেখ আছে। এগুলির মধ্যে  রাম-বিক্রম, জানকীরাঘব, রামানন্দ, অযোধ্যা-ভরত, কৈকেয়ী-ভরত, বালিবধ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। (ক্রমশঃ)

বঙ্গ, বাঙ্গালী এবং রামায়ণ (১)

রাঢ়বঙ্গের প্রসিদ্ধ কবি – “কবিচন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তী”। মধ্যযুগে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের ভাবানুবাদ পালাগানের রূপে রচনা করেছেন। এর মধ্যে বিষ্ণুপুরী রামায়ণ উল্লেখযোগ্য।

কবিচন্দ্রের দৌহিত্র বংশজাত শ্রী মাখনলাল মুখোপাধ্যায় কবিচন্দ্রের একটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেন ১৩৪১ সালে। ভগবতামৃত শ্রী শ্রী গোবিন্দমঙ্গল নামের এই গ্রন্থের ভূমিকায় বিষ্ণুপুরী রামায়ণ কথাটা বাংলা সাহিত্যে প্রথমবার লিপিবদ্ধ হয়। এর আগে এই শব্দ লোকমুখে বহুল প্রচলিত ছিল।

তাঁর রচনায় ‘রামলীলা’, ‘রামমঙ্গল’ শব্দগুলি বহুল ব্যবহৃত। অধ্যাপক মণীন্দ্র মোহন বসুর কথায়, “কবিচন্দ্রের গ্রন্থ বিষ্ণুপুর অঞ্চলে গীত ও পঠিত হ‌ইত, এজন্য ইহা বিষ্ণুপুরী রামায়ণ নামেও প্রসিদ্ধ হ‌ইয়াছিল” (*)। এই প্রসঙ্গে ডঃ সুকুমার সেনের বক্তব্য, “কবিচন্দ্রের অধ্যাত্ম রামায়ণ নিবন্ধটি দক্ষিণ রাঢ়ে ‘বিষ্ণুপুরী রামায়ণ’ নামে একদা প্রসিদ্ধ হ‌ইয়াছিল”(**)। ডঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “কবি যে নিষ্ঠা সহকারে কোনও বিশেষ সংস্কৃত কাব্যের অনুবাদ করেন নাই তাহা তিনি নিজেই স্বীকার করিয়াছেন। বাল্মীকি রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, নিজস্ব কল্পনা প্রভৃতি মিশাইয়া কবি এই মিশ্র ধরণের রামকাব্য লিখিয়াছেন” (***)।

বঙ্গ এবং বাঙ্গালীর সাথে নাকি রামচন্দ্রের কোনও সম্পর্ক নেই। রাম নাকি বহিরাগত! – এই ধরণের ন্যারেটিভ বাজারে ছাড়া হয়েছে। তাই এই আলোচনা শুরু করলাম।

তথ্যসূত্র:
* বাঙ্গালা সাহিত্য: মণীন্দ্র মোহন বসু, দ্বিতীয় খন্ড ১৯৪৭, পৃষ্ঠা-১৪৭
** বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস: সুকুমার সেন, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৬৫, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৫৮
*** বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত: অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম সংস্করণ ১৯৬৬, পৃষ্ঠা- ১০৪৭

মাৎসন্যায় এবং যুগধর্ম

পুকুরে মাছেরা যখন একসাথে থাকে তখন কয়েকটি আগ্রাসী প্রকৃতির মাছ বাকী মাছেদের আক্রমণ করে মেরে ফেলে৷ কে কাকে মারবে, সবক্ষেত্রে তা মাছের আকারের উপরে নির্ভর করে না৷ তা মূলতঃ নির্ভর করে মাছের প্রকৃতি বা স্বভাবের উপরে৷ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বোয়াল বা ভেটকী মাছের কথা৷ কোন পুকুরে বোয়াল অথবা ভেটকী মাছ থাকলে সেই পুকুরে অন্য কোন প্রজাতির মাছ থাকতে পারে না৷ এক্ষেত্রে বোয়াল এবং ভেটকী মাছ অন্য মাছদের আক্রমণ করে এবং খেয়ে ফেলে৷ আবার তেলাপিয়া মাছের বংশবৃদ্ধির হার এত বেশী যে তাদের ভীড়ের চাপে পুকুরে অন্য মাছের স্থান এবং খাদ্য-দুইয়েরই অভাব হয়ে পড়ে৷ সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার মিষ্টি জলের পুকুরে কাঠকৈ নামের মাছ পাওয়া যায়৷ এরা আকারে ছোট কিন্তু দলবদ্ধ এবং হিংস্র৷ এরা দল বেঁধে অনেক বড় বড় মাছকে শিকার করে৷ পুকুরে এই তিন ধরণের মাছের যে কোন এক প্রজাতির উপস্থিতিই বাকী সব প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব শেষ করার জন্য যথেষ্ট৷ আর যদি এরকম কোন মাছ থাকে, যার আকার বড়, যারা দলবদ্ধ, হিংস্র ও আগ্রাসী তাহলে তো আর কথাই নেই৷

এখন অনেকে বলবেন মাছ তো মাছই, সব মাছই সমান, যারা মাছে মাছে পার্থক্য করে তারা অজ্ঞ৷ তাদের এই কথা এক অর্থে সঠিক হলেও তাদের কথা শুনে কেউ যদি একই পুকুরে সাধারণ মাছের সাথে সাথে বোয়াল, ভেটকী ইত্যাদি মাছ চাষ করেন, তাহলে তিনি সর্বস্বান্ত হবেন একথা বলাই বাহুল্য৷ ঠিক তেমন ভাবে যারা বলেন মানুষ তো মানুষই, সব মানুষ সমান, মানুষে মানুষে বিভেদ করা উচিত নয় – তাদের কথা আপাত দৃষ্টিতে সত্যি এবং আকর্ষণীয় মনে হলেও মোটেই বাস্তব সম্মত নয়৷ কারণ সবাই মানুষ হলেও আপনি কি আপনার বাড়ীর ভিতরে আপনার পরিবারের সদস্যদের সাথে একজন চোর, একজন সিরিয়াল কিলার এবং একজন দাগী ধর্ষণকারীকে একসাথে বসবাস করার অনুমতি দেবেন? যদি দেন তাহলে তার পরিণতি কি হবে, তা আশা করি বলে দিতে হবে না৷

মানুষ সবাই সমান হলেও আবার সবাই সমান নয়৷ বাস্তব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছ ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে এই পার্থক্য বোঝা যায়৷ বস্তুবাদী(materialistic) অথবা আধ্যাত্মিক(spiritual) – যে কোন ভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সব কিছুর মূলতত্ত্ব একই৷ সেই দৃষ্টিতে একটি সূস্থ কুকুর আর একটি পাগল কুকুরের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, উভয়েই কুকুর৷ কিন্তু তাই বলে কি পাগল কুকুরের সাথে গলাগলি করা কান্ডজ্ঞানের পরিচায়ক হবে? কেউ যদি তা করতে চায় তাহলে সে খালি নিজেরই নয়, আরও অনেকের বিপদ ডেকে আনবে৷ এখন আমাদের সমাজের মধ্যেই কিছু লোকের মনে হচ্ছে যে আমরাই শ্রেষ্ঠ, বাকীরা নিকৃষ্ট৷ সমস্ত জড়বস্তু, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নারীজাতি – সবই আমাদের উপভোগের জন্য ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন৷ আমরা যা বিশ্বাস করি, সেটাই একমাত্র সঠিক এবং সবাইকে সেটাই বিশ্বাস করতে হবে৷ আমরা যে পথে চলতে চাই বাকীদেরকেও সেই পথেই চলতে হবে৷ অন্যথা হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে অনন্ত কাল ধরে যুদ্ধ করবো৷ তাদের সবাইকে হত্যা করবো৷ তাদের সম্পত্তি লুঠ করবো৷ তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করবো, দাসী বানিয়ে খোলা বাজারে নিলাম করবো৷ এটাই পূণ্যের কাজ৷ এটাই স্বর্গ প্রাপ্তির উপায়৷ এটাই ঈশ্বর নির্দিষ্ট পবিত্র কর্তব্য৷ এই কাজ নিষ্ঠার সাথে করলে ঈশ্বর খুশী হবেন এবং আশির্বাদ করবেন৷ এভবেই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে৷ এই বিশ্বাসই হল সমস্ত আব্রাহামিক মতাদর্শের মূল ভিত্তি ৷

পাশাপাশি কিছু লোক মনে করে সবারই চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস, অভিব্যক্তির স্বাধীনতা আছে যতক্ষণ পর্যন্ত তা বাকীদের উপরে বিরূপ প্রভাব না ফেলছে৷ তারা মনে করে জীব-জড় সম্বলিত এই প্রকৃতি ঈশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপের বহিপ্রকাশ মাত্র৷ তাই তারা সর্ব জীবে শিব দেখে৷ তাই তারা সঙ্ঘর্ষ নয়, সমন্বয়কেই শান্তির একমাত্র উপায় বলে মনে করে৷ এই চিন্তাধারা হল ভারতের মাটিতে উদ্ভূত সকল মতাদর্শের মূল ভিত্তি৷

এখন প্রশ্ন হলো, উপরোক্ত দুই ধরণের মনুষ কি সমান? উভয় প্রকারের চিন্তা ভাবনাই কি সমান পর্যায়ের? উভয় প্রকারের চিন্তা ভাবনাই কি সমানভাবে সকলের জন্য মঙ্গলকারী? পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিরিখে, মানবের সার্বিক বিকাশের জন্য যোগ্য পরিবেশ তৈরীর নিরিখে দুই ধরণের চিন্তাই কি সমান ভাবে কার্যকারী? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে উত্তর হবে ‘না’৷

তাহলে সব ধর্মমত সমান, সব ধর্মের সার এক ইত্যাদি কথা প্রচার করে থাকেন, তারা কী যুক্তিতে কথাগুলি বলছেন- তা সর্ব সমক্ষে জিজ্ঞাসা করা কি আমাদের উচিত নয়? তারা যখন বলেন গীতা-কোরাণ-বাইবেলে একই কথা লেখা আছে, তখন কি আমাদের একটু যাচাই করে নেওয়া উচিত নয় যে বক্তা ওই ধর্মগ্রন্থগুলি আদৌ পড়েছেন কি না?

ভারতবর্ষকে ধ্বংস করার জন্য এক বিরাট চক্রান্ত চলছে৷ হিন্দুদের বিভ্রান্ত করে হীনবল করে রাখা হচ্ছে৷ এখানে একই পুকুরে আমাদের মত রুই-কাতলার সাথে বোয়াল-তেলাপিয়ার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অবাস্তব স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে৷ এর পরিণাম হল সম্পূর্ণ ভারতের ইসলামিকরণ৷ হিংসা আর প্রেম কখনও এক হয় না৷ সঙ্ঘর্ষ আর সমন্বয় কোনদিনও এক হতে পারে না৷ হিংসা ও সঙ্ঘর্ষ হল অধর্ম আর প্রেম ও সমন্বয় হল ধর্ম৷ তবে ধর্মের এই সংজ্ঞা প্রযোজ্য হবে সাধরণ পরিস্থিতিতে ৷ কিন্তু যখনই অধর্ম মাথা তুলবে, ধর্মের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, তখন ধর্ম পালনের থেকে ধর্মের সংরক্ষণকেই প্রাথমিকতা দিতে হবে৷ আর যুদ্ধক্ষেত্রে ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ’ হল থাম্বরুল, সে কথা ভগবান শ্রীরাম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন৷ অধর্মের বিনাশ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে হিংসা ও সঙ্ঘর্ষের পথ অবলম্বন করাই যে সব থেকে বড় ধর্ম তা বোঝানোর জন্য ভগবান স্বয়ং বারবার অস্ত্রধারণ করেছেন৷ কখনও নৃসিংহদেব, কখনও রামচন্দ্র হয়ে নিজের হাতে হিরণ্যকশিপু, রাবণ বধ করেছেন৷ কখনও শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আত্মীয় স্বজনদের হত্যা করতে পান্ডবদের প্রেরণা দিয়েছেন৷ আজ এই দেশ-ধর্ম রক্ষা করতে হলে ভগবান প্রদর্শিত এই পথেই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে৷ এই ধর্মপথ ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই৷

LIC in a new form

প্রায় ১৫বছর আগের কথা৷ আমি তখন আসামে৷ একজন আর্মি ইন্টালিজেন্স অফিসার মাঝে মাঝে দেখা করতে আসতেন৷ আলোচনা প্রসঙ্গে উনি একদিন বললেন, আসামে ISI তার নেটওয়ার্ক ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু হিন্দুদের উপরে সংগঠিতভাবে কোন আক্রমণ যাতে না হয়, সে ব্যাপারে তারা কঠোর নির্দেশ দিয়েছে তাদের এজেন্টদের৷ তাদের পরিকলপনা, আসাম দখল করতে আর ডাইরেক্ট অ্যাকশন করার দরকার নেই৷ সেখানে হিন্দুদের উপরে বড় ধরণের কোন আঘাত হলে সারা ভারতের হিন্দুরা সচেতন এবং সতর্ক হয়ে যাবে৷ এতে তাদের বৃহত্তর পরিকল্পনা রূপায়নের কাজ কঠিন হয়ে যাবে৷ তাই আসাম দখল হবে, কিন্তু তার আঁচ বেশী লোকের গায়ে লাগবে না, কোন মিডিয়ায় প্রচার হবে না, লোকেরা গুরুত্ব দেবে না – সেই রকম একটা রণকৌশল তৈরী করে তার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছে ISI৷

এই প্রোজেক্টের নাম দিয়েছে LIC! মানে LOW INTENSITY CONFLICTS মানে ছোট ছোট সঙ্ঘর্ষ – ডাকাতি, রেপ, গণধোলাই, বাজার লুঠ ইত্যাদি৷ যেভাবেই হোক ঘটনাগুলোকে ছোট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, যার প্রভাব ছোট এলাকার মধ্যে প্রবল ভাবে পড়বে৷ এই সব ঘটনার খবর বেশী দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে না৷ যদিও পৌঁছায়, হিন্দুরা সেগুলোকে Law & order problem বা আইন শৃঙ্খলার অবনতি বলে বিশেষ গুরুত্ব দেবে না৷ মোটকথা, বৃহত্তর বিপদের কথা কোনভাবেই আঁচ করবে না এবং কেউ বুঝানোর চেষ্টা করলে বিশ্বাসও করবে না৷ কিন্তু যারা ভুক্তভোগী, তাদেরকে এবং এলাকার বাকী হিন্দুদেরকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হবে যে, এই ডাকাতি কিংবা রেপ হল ইসলামিক সন্ত্রাস৷ এখানেই এর শেষ নয়৷ এখানে থাকলে এধরণের ঘটনা বার বার ঘটবে৷ তাই মানে মানে এলাকা ছেড়ে পালাও৷ তোমার এই সম্পত্তি কিনে নেওয়ার লোক আছে, প্রয়োজনে বেশী দাম পাবে৷ সোজা কথায় পরিকলপনা হল আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ গ্রামের দখল নেওয়া৷

প্রথমত, এই একই পরিকল্পনার ছাপ কি আমরা পশ্চিমবাংলার বুকে রূপায়িত হতে দেখতে পাচ্ছি? মল্লিকপুর, উস্তি, জুরানপুর, হাঁসখালি, পঞ্চগ্রাম, বিকি হাকোলা, চন্ডিপুর, নৈহাটি, গয়েশপুর, বাঁশবেড়িয়া, ধুলাগড়, বসিরহাট – একের পর এক সন্ত্রাসের ঘটনা কিসের ইঙ্গিত বহন করছে? কামদুনী থেকে শুরু করে রূপনগর-তারানগর, নোরিট, নির্মাণ দত্তপাড়ার ধর্ষণের ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনারূপেই থেকে যায় নি? হিন্দু সংহতি না থাকলে তো বেশীরভাগ ঘটনার খবরই কেউ জানতে পারতো না!

দ্বিতীয়ত, এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করছে কারা? পাকিস্তান আর বাংলাদেশ লোক পাঠাচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে যাদেরকে পাঠাচ্ছে, তাদেরকে এলাকার পথঘাট চেনাচ্ছে কারা? ঘরভাড়া করে দিচ্ছে কারা? পুলিশ-গোয়েন্দাদের থেকে আড়াল করে রাখছে কারা? সন্ত্রাসবাদী প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র মজুত করার জায়গা দিচ্ছে কারা? মল্লিকপুর থেকে বসিরহাট – হিন্দুদের উপরে যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তারা কি পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ থেকে আমদানী হওয়া সন্ত্রাসবাদী? এই সমস্ত প্রশ্ন কিন্তু অনেকেই বিব্রত হবেন৷ কারণ শাক দিয়ে মাছ ঢাকা দেওয়া আর তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না৷ এইভাবেই দুই ২৪ পরগণা, নদীয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদ, উঃ দিনাজপুর, বীরভূম – জেলাগুলিতে জনসংখ্যার ভারসাম্যের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়ে গেছে৷ ওই জেলাগুলোতে প্রতিদিন হিন্দুরা সব ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ হিন্দুরা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছে৷ বাকী যে জায়গার মুসলমানরা সংখ্যায় এবং শক্তিতে critical mass এ পৌঁছাতে পারে নি, তারা হিন্দুদের সঙ্গে “একই বৃন্তে দুটি কুসুম” হয়ে বসবাস করছে৷ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঝান্ডা উড়িয়ে রেখেছে সযত্নে৷ তারা যে অপেক্ষা করছে ৩০% এর বেঞ্চমার্ক ছোঁয়ার জন্য, সেটা সেখানকার হিন্দুরা বুঝতে পারছে না৷ যখন বুঝবে তখন সময় পেরিয়ে যাবে৷

বন্ধু প্রত্যুষ আর আমি কুচবিহার স্টেশনের বাইরে খিচুড়ি খাচ্ছিলাম৷ গরম খিচুড়ি, খাওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই৷ হঠাৎ দেখলাম প্রত্যুষ কিন্তু প্রায় শেষ করে ফেলেছে৷ ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,’আপনি খিচুড়ি খাওয়ার টেকনিক জানেন না৷ গরম খিচুড়ি সাইড থেকে খেতে খেতে মাঝখানে আসতে হয়৷’ সত্যিই আমি জানতাম না, অনেকেই জানেন না৷ তবে মুসলমানরা যে গরম খিচুড়ি খাওয়ার টেকনিকটা ভালো জানে, তা পরিস্থিতি দেখেই বোঝা যাচ্ছে

ভারতে গোহত্যা- শুধুই কি খাওয়ার জন্য?

গরু কে কেউ মা বললেও যেমন আমার আপত্তি নেই, আবার গরুকে কেউ নিছক খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করলেও আমার কোন আপত্তি নেই৷ কারণ শ্রদ্ধা মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে তৈরী হয়৷ এই বিশ্বাস কতটা যুক্তিপূর্ণ সেটা সেই বিশ্বাসী ব্যক্তির মানসিক গঠন, তার শিক্ষা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির গতি প্রকৃতির বিষয়ে তার knowledge এবং observation ইত্যাদির উপরে নির্ভর করে৷ কিন্তু যতই অযৌক্তিক মনে হোক না কেন, যে কোন কিছু বিশ্বাস করার পূর্ণ স্বাধীনতা মানুষের আছে যতক্ষণ না তার সেই বিশ্বাস অন্যের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে, তার বিশ্বাস সমাজ এবং প্রাকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করছে৷ দেশ, জাতি তথা বিশ্বমানবতার স্বার্থের পরিপন্থী না হওয়া পর্যন্ত কোন ব্যক্তির বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই৷ তবে মানুষের বিশ্বাস নিশ্চই যুক্তি নির্ভর হওয়া উচিত৷ পাশাপাশি সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও কিছু কিছু বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা মানুষের মনে পরম্পরাগতভাবে তৈরী হয়ে থাকে, হয়তো তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে আছে৷

আমি সুনামীর পরে লিটল আন্দামানে গিয়েছিলাম৷ সেখানে স্থানীয় বাসীন্দাদের মধ্যে একজন তার অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে বললেন, কয়েক পুরুষ ধরে সেখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস, সমুদ্র যখন দূরে সরে যায় তখন মানুষেরও উচিত সমুদ্র থেকে দূরে সরে যাওয়া৷ সুনামীর ঢেউ যখন আছড়ে পড়ল, ঠিক তার আগে সমুদ্রের জল অনেক দূরে পিছিয়ে গিয়েছিল৷ বিশ্বাসের ভিত্তিতে যারা তা দেখে তখন সমুদ্র থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, তারা বেঁচে গিয়েছিলেন৷ আর যারা এই বিশ্বাসকে কুসংস্কার মনে করে তাচ্ছিল্য করেছিলেন, তারা আজ আর বেঁচে নেই! অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না জানলেও অভিজ্ঞতা ও observation এর ভিত্তিতে যে বিশ্বাস তৈরী হয়, তা নিশ্চই উপহাসের বিষয় হতে পারে না৷ গরুকে মা বলতে অস্বীকার করার অধিকার আমার আছে৷ কিন্তু কেউ যদি গরুকে মা বলে বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা করে – তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাটাকে আমি কোনভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে করি না৷ এটাও এক ধরণের সঙ্কীর্ণ মানসিকতার লক্ষণ৷

দ্বিতীয় বিষয় খাদ্যাভ্যাস৷ মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরী হয় মূলতঃ খাদ্যের খাদ্যগুণ এবং তার availability র উপরে ভিত্তি করে৷ মানুষ সব সময় সস্তায় পুষ্টিকর খাবার খোঁজে৷ যে খাবার যত বেশী available, তার দাম তত কম৷ আমরা ছোটবেলায় পাঁঠার মাংসই বেশী খেতাম৷ ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকল, দেশী মুরগী সেই জায়গা দখল করতে লাগলো৷ প্রথম প্রথম মুরগী সাধারণ হিন্দু পরিবারগুলোতে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷ অনেক বাড়ীতে আলাদা বাসন ছিল মুরগী রান্না করার জন্য! পুরোনো লোকেরা বলতেন – মুরগী ম্লেচ্ছদের খাবার! এখনকার প্রজন্ম ভাবতে পারে এসব কথা? পরে পোল্ট্রি চলে এলো৷ ইদানীং শুকরের মাংসও ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে৷ আমার বলার বিষয় হচ্ছে খাদ্য নির্বাচনের এই বিবর্তন একটা natural process ৷ এ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আজ কেউ কি বলতে পারে?

এখন এই খাদ্য নির্বাচনের সময় আরও কিছু বিষয় বিচার্য থেকে যায়৷ সেগুলো হল বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য ঠিক থাকছে কি না, আমরা খেয়ে খেয়েই অনেক প্রজাতির পশুকে পৃথিবী থেকেই বিলোপ করে দিতে চলেছি কি না, কোন পশুর মাংস হিসাবে পেটে যাওয়ার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অন্য বিশেষ উপযোগিতা আছে কি না? ইত্যাদি বিচার করে পশুহত্যা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের৷ কারণ সরকারের হাতে  উপরোক্ত বিচার্য বিষয়গুলোর সঠিক অধ্যয়ন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য মেশিনারি আছে৷ আমাদের বাজারে আগে কচ্ছপের মাংস বিক্রি হত, আজকে তা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ৷ হরিণের মাংস, বুনো শুয়োরের মাংসের স্বাদ থেকে সরকার আমাদের বঞ্চিত করেছে৷ আমরা কিন্তু মেনে নিয়েছি৷

কিন্তু দেখা যাচ্ছে ভারতে গোহত্যার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট সহ একাধিক হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা জারী করা সত্ত্বেও তাকে সম্পূর্ণভাবে অমান্য করা হচ্ছে৷ কোনও ধর্মীয় ground এ এই নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে তা নয়৷ দুধ সরবরাহ এবং কৃষিকাজের ক্ষেত্রে আজও গরুর উপযোগিতা অনস্বীকার্য৷ তাই গরুকে সম্পদ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে গোসম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত৷ West Bengal Animal Slaughter Control Act, 1950 অনুসারে পশ্চিমবঙ্গেও প্রজননে, কৃষিকাজে সক্ষম ও ১৪ বছরের কম বয়সী গরুকে হত্যা করা নিষিদ্ধ৷ তা সত্ত্বেও বাস্তবে কি ঘটে চলেছে তা আমাদের কারো অজানা নয়৷ ধর্মের নাম দিয়ে আদালতের অবমাননা করা হচ্ছে বুক ঠুকে! ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ভারতের শিশুদের গোদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে বিনা বাধায়!

কৃষিকাজে মুসলমানরা কি গরু ব্যবহার করে না? করে৷ মুসলমান শিশুরা কি গরুর দুধ খায় না? খায়৷ গোসম্পদ সংরক্ষণ হলে কি শুধু হিন্দুদেরই লাভ হবে? নিশ্চই না৷ তা সত্ত্বেও গরু কাটার প্রতি এত আগ্রহ কেন মুসলিম সমাজের? কারণ হিন্দুদের উপরে নিজেদের সুপ্রীমেসিকে প্রতিষ্ঠিত রাখা৷ শক-হূণেরা ভারতে এসে একদেহে লীন হয়ে যেতে পারলেও পাঠান-মোগলরা পারে নি৷ কোনদিন পারবেও না৷ কারণ ইসলামের কোর্ হচ্ছে seperatism! তারা পৃথিবীর কোন দেশে গিয়ে মূল সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে নি৷ তাদের মুখে সর্বত্র একই দাবি – আলাদা স্টেটাস চাই৷ আলাদা আইন, আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা, আলাদা ভাষা, আলাদা পতাকা ……… আলাদা দেশ!

কেউ সাধারণভাবে গরু খেলে আমার কোন আপত্তি নেই৷ উত্তর পূর্বাঞ্চলের অনেক জনগোষ্ঠীর সাথে গভীর ভাবে মিশে দেখেছি তারা সবদিক দিয়ে হিন্দু হলেও গরু খায়৷ এতে তাদের হিন্দুত্ব বিন্দুমাত্র ফিকে হয়ে যায় বলে আমি মনে করি না৷ তারা এই দেশকে ভালোবাসে, দেশের অখন্ডতা রক্ষায় জীবন দেওয়াকে তারা ধর্ম মনে করে৷ তাই গরু খেলেও কিছু এসে যায় না৷ কিন্তু ভারতের বৃহত্তম হিন্দু সমাজের moral down করার উদ্দেশ্য নিয়ে, ভারতের সংবিধান ও আইনকে অপমানিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে, ভারতের বুকে বসে seperatism এর ভাবনাকে জাগিয়ে রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে গোহত্যা করার প্রবণতা মুসলমানদের ত্যাগ করা উচিত৷ 

পরিশেষে সেকু-মাকু ভাইদের কাছে বিনম্র নিবেদন, মুসলমানদের এই গোহত্যা করার আগ্রহের পিছনে motive টাকে অনুধাবন করুন৷ এদের সমর্থন করার অর্থ হচ্ছে ভারত ভাঙার চক্রান্তকে সমর্থন করা৷ এদের শক্তিবৃদ্ধি করার অর্থ হচ্ছে সেকুলারিজমকে হত্যা করা, লিবারালিজমকে ধ্বংস করা৷ রুশদী, তসলিমা, হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে সম্প্রতি নিহত মুক্তমনা ব্লগারদের পরিণতির কথা ভাবুন৷ যে কোন এলাকার সেকুলার, লিবারাল পরিবেশ সেখানকার মুসলিমদের শক্তির সাথে inversely proportional! মানলাম আপনারা শিক্ষিত, চাড্ডিরা অশিক্ষিত৷ কিন্তু মাঝনদীতে ঝড় উঠলে সেই অশিক্ষিত মাঝিই কিন্তু আপনাদের মত বিদ্যেবোঝাই বাবু মশাইদের পরিত্রাতা, সেই অশিক্ষিত চাড্ডিরা গদা হাতে না দাঁড়ালে মুক্তমনা ব্লগারদের মত আপনাদের জীবনটাও যে ষোল আনাই মিছে এটা ভুলবেন না৷