বঙ্গ, বাঙ্গালী এবং রামায়ণ (১)

রাঢ়বঙ্গের প্রসিদ্ধ কবি – “কবিচন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তী”। মধ্যযুগে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের ভাবানুবাদ পালাগানের রূপে রচনা করেছেন। এর মধ্যে বিষ্ণুপুরী রামায়ণ উল্লেখযোগ্য।

কবিচন্দ্রের দৌহিত্র বংশজাত শ্রী মাখনলাল মুখোপাধ্যায় কবিচন্দ্রের একটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেন ১৩৪১ সালে। ভগবতামৃত শ্রী শ্রী গোবিন্দমঙ্গল নামের এই গ্রন্থের ভূমিকায় বিষ্ণুপুরী রামায়ণ কথাটা বাংলা সাহিত্যে প্রথমবার লিপিবদ্ধ হয়। এর আগে এই শব্দ লোকমুখে বহুল প্রচলিত ছিল।

তাঁর রচনায় ‘রামলীলা’, ‘রামমঙ্গল’ শব্দগুলি বহুল ব্যবহৃত। অধ্যাপক মণীন্দ্র মোহন বসুর কথায়, “কবিচন্দ্রের গ্রন্থ বিষ্ণুপুর অঞ্চলে গীত ও পঠিত হ‌ইত, এজন্য ইহা বিষ্ণুপুরী রামায়ণ নামেও প্রসিদ্ধ হ‌ইয়াছিল” (*)। এই প্রসঙ্গে ডঃ সুকুমার সেনের বক্তব্য, “কবিচন্দ্রের অধ্যাত্ম রামায়ণ নিবন্ধটি দক্ষিণ রাঢ়ে ‘বিষ্ণুপুরী রামায়ণ’ নামে একদা প্রসিদ্ধ হ‌ইয়াছিল”(**)। ডঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “কবি যে নিষ্ঠা সহকারে কোনও বিশেষ সংস্কৃত কাব্যের অনুবাদ করেন নাই তাহা তিনি নিজেই স্বীকার করিয়াছেন। বাল্মীকি রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, নিজস্ব কল্পনা প্রভৃতি মিশাইয়া কবি এই মিশ্র ধরণের রামকাব্য লিখিয়াছেন” (***)।

বঙ্গ এবং বাঙ্গালীর সাথে নাকি রামচন্দ্রের কোনও সম্পর্ক নেই। রাম নাকি বহিরাগত! – এই ধরণের ন্যারেটিভ বাজারে ছাড়া হয়েছে। তাই এই আলোচনা শুরু করলাম।

তথ্যসূত্র:
* বাঙ্গালা সাহিত্য: মণীন্দ্র মোহন বসু, দ্বিতীয় খন্ড ১৯৪৭, পৃষ্ঠা-১৪৭
** বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস: সুকুমার সেন, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৬৫, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৫৮
*** বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত: অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম সংস্করণ ১৯৬৬, পৃষ্ঠা- ১০৪৭

মাৎসন্যায় এবং যুগধর্ম

পুকুরে মাছেরা যখন একসাথে থাকে তখন কয়েকটি আগ্রাসী প্রকৃতির মাছ বাকী মাছেদের আক্রমণ করে মেরে ফেলে৷ কে কাকে মারবে, সবক্ষেত্রে তা মাছের আকারের উপরে নির্ভর করে না৷ তা মূলতঃ নির্ভর করে মাছের প্রকৃতি বা স্বভাবের উপরে৷ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বোয়াল বা ভেটকী মাছের কথা৷ কোন পুকুরে বোয়াল অথবা ভেটকী মাছ থাকলে সেই পুকুরে অন্য কোন প্রজাতির মাছ থাকতে পারে না৷ এক্ষেত্রে বোয়াল এবং ভেটকী মাছ অন্য মাছদের আক্রমণ করে এবং খেয়ে ফেলে৷ আবার তেলাপিয়া মাছের বংশবৃদ্ধির হার এত বেশী যে তাদের ভীড়ের চাপে পুকুরে অন্য মাছের স্থান এবং খাদ্য-দুইয়েরই অভাব হয়ে পড়ে৷ সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার মিষ্টি জলের পুকুরে কাঠকৈ নামের মাছ পাওয়া যায়৷ এরা আকারে ছোট কিন্তু দলবদ্ধ এবং হিংস্র৷ এরা দল বেঁধে অনেক বড় বড় মাছকে শিকার করে৷ পুকুরে এই তিন ধরণের মাছের যে কোন এক প্রজাতির উপস্থিতিই বাকী সব প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব শেষ করার জন্য যথেষ্ট৷ আর যদি এরকম কোন মাছ থাকে, যার আকার বড়, যারা দলবদ্ধ, হিংস্র ও আগ্রাসী তাহলে তো আর কথাই নেই৷

এখন অনেকে বলবেন মাছ তো মাছই, সব মাছই সমান, যারা মাছে মাছে পার্থক্য করে তারা অজ্ঞ৷ তাদের এই কথা এক অর্থে সঠিক হলেও তাদের কথা শুনে কেউ যদি একই পুকুরে সাধারণ মাছের সাথে সাথে বোয়াল, ভেটকী ইত্যাদি মাছ চাষ করেন, তাহলে তিনি সর্বস্বান্ত হবেন একথা বলাই বাহুল্য৷ ঠিক তেমন ভাবে যারা বলেন মানুষ তো মানুষই, সব মানুষ সমান, মানুষে মানুষে বিভেদ করা উচিত নয় – তাদের কথা আপাত দৃষ্টিতে সত্যি এবং আকর্ষণীয় মনে হলেও মোটেই বাস্তব সম্মত নয়৷ কারণ সবাই মানুষ হলেও আপনি কি আপনার বাড়ীর ভিতরে আপনার পরিবারের সদস্যদের সাথে একজন চোর, একজন সিরিয়াল কিলার এবং একজন দাগী ধর্ষণকারীকে একসাথে বসবাস করার অনুমতি দেবেন? যদি দেন তাহলে তার পরিণতি কি হবে, তা আশা করি বলে দিতে হবে না৷

মানুষ সবাই সমান হলেও আবার সবাই সমান নয়৷ বাস্তব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছ ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে এই পার্থক্য বোঝা যায়৷ বস্তুবাদী(materialistic) অথবা আধ্যাত্মিক(spiritual) – যে কোন ভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সব কিছুর মূলতত্ত্ব একই৷ সেই দৃষ্টিতে একটি সূস্থ কুকুর আর একটি পাগল কুকুরের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, উভয়েই কুকুর৷ কিন্তু তাই বলে কি পাগল কুকুরের সাথে গলাগলি করা কান্ডজ্ঞানের পরিচায়ক হবে? কেউ যদি তা করতে চায় তাহলে সে খালি নিজেরই নয়, আরও অনেকের বিপদ ডেকে আনবে৷ এখন আমাদের সমাজের মধ্যেই কিছু লোকের মনে হচ্ছে যে আমরাই শ্রেষ্ঠ, বাকীরা নিকৃষ্ট৷ সমস্ত জড়বস্তু, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নারীজাতি – সবই আমাদের উপভোগের জন্য ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন৷ আমরা যা বিশ্বাস করি, সেটাই একমাত্র সঠিক এবং সবাইকে সেটাই বিশ্বাস করতে হবে৷ আমরা যে পথে চলতে চাই বাকীদেরকেও সেই পথেই চলতে হবে৷ অন্যথা হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে অনন্ত কাল ধরে যুদ্ধ করবো৷ তাদের সবাইকে হত্যা করবো৷ তাদের সম্পত্তি লুঠ করবো৷ তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করবো, দাসী বানিয়ে খোলা বাজারে নিলাম করবো৷ এটাই পূণ্যের কাজ৷ এটাই স্বর্গ প্রাপ্তির উপায়৷ এটাই ঈশ্বর নির্দিষ্ট পবিত্র কর্তব্য৷ এই কাজ নিষ্ঠার সাথে করলে ঈশ্বর খুশী হবেন এবং আশির্বাদ করবেন৷ এভবেই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে৷ এই বিশ্বাসই হল সমস্ত আব্রাহামিক মতাদর্শের মূল ভিত্তি ৷

পাশাপাশি কিছু লোক মনে করে সবারই চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস, অভিব্যক্তির স্বাধীনতা আছে যতক্ষণ পর্যন্ত তা বাকীদের উপরে বিরূপ প্রভাব না ফেলছে৷ তারা মনে করে জীব-জড় সম্বলিত এই প্রকৃতি ঈশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপের বহিপ্রকাশ মাত্র৷ তাই তারা সর্ব জীবে শিব দেখে৷ তাই তারা সঙ্ঘর্ষ নয়, সমন্বয়কেই শান্তির একমাত্র উপায় বলে মনে করে৷ এই চিন্তাধারা হল ভারতের মাটিতে উদ্ভূত সকল মতাদর্শের মূল ভিত্তি৷

এখন প্রশ্ন হলো, উপরোক্ত দুই ধরণের মনুষ কি সমান? উভয় প্রকারের চিন্তা ভাবনাই কি সমান পর্যায়ের? উভয় প্রকারের চিন্তা ভাবনাই কি সমানভাবে সকলের জন্য মঙ্গলকারী? পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিরিখে, মানবের সার্বিক বিকাশের জন্য যোগ্য পরিবেশ তৈরীর নিরিখে দুই ধরণের চিন্তাই কি সমান ভাবে কার্যকারী? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে উত্তর হবে ‘না’৷

তাহলে সব ধর্মমত সমান, সব ধর্মের সার এক ইত্যাদি কথা প্রচার করে থাকেন, তারা কী যুক্তিতে কথাগুলি বলছেন- তা সর্ব সমক্ষে জিজ্ঞাসা করা কি আমাদের উচিত নয়? তারা যখন বলেন গীতা-কোরাণ-বাইবেলে একই কথা লেখা আছে, তখন কি আমাদের একটু যাচাই করে নেওয়া উচিত নয় যে বক্তা ওই ধর্মগ্রন্থগুলি আদৌ পড়েছেন কি না?

ভারতবর্ষকে ধ্বংস করার জন্য এক বিরাট চক্রান্ত চলছে৷ হিন্দুদের বিভ্রান্ত করে হীনবল করে রাখা হচ্ছে৷ এখানে একই পুকুরে আমাদের মত রুই-কাতলার সাথে বোয়াল-তেলাপিয়ার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অবাস্তব স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে৷ এর পরিণাম হল সম্পূর্ণ ভারতের ইসলামিকরণ৷ হিংসা আর প্রেম কখনও এক হয় না৷ সঙ্ঘর্ষ আর সমন্বয় কোনদিনও এক হতে পারে না৷ হিংসা ও সঙ্ঘর্ষ হল অধর্ম আর প্রেম ও সমন্বয় হল ধর্ম৷ তবে ধর্মের এই সংজ্ঞা প্রযোজ্য হবে সাধরণ পরিস্থিতিতে ৷ কিন্তু যখনই অধর্ম মাথা তুলবে, ধর্মের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, তখন ধর্ম পালনের থেকে ধর্মের সংরক্ষণকেই প্রাথমিকতা দিতে হবে৷ আর যুদ্ধক্ষেত্রে ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ’ হল থাম্বরুল, সে কথা ভগবান শ্রীরাম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন৷ অধর্মের বিনাশ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে হিংসা ও সঙ্ঘর্ষের পথ অবলম্বন করাই যে সব থেকে বড় ধর্ম তা বোঝানোর জন্য ভগবান স্বয়ং বারবার অস্ত্রধারণ করেছেন৷ কখনও নৃসিংহদেব, কখনও রামচন্দ্র হয়ে নিজের হাতে হিরণ্যকশিপু, রাবণ বধ করেছেন৷ কখনও শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আত্মীয় স্বজনদের হত্যা করতে পান্ডবদের প্রেরণা দিয়েছেন৷ আজ এই দেশ-ধর্ম রক্ষা করতে হলে ভগবান প্রদর্শিত এই পথেই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে৷ এই ধর্মপথ ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই৷

LIC in a new form

প্রায় ১৫বছর আগের কথা৷ আমি তখন আসামে৷ একজন আর্মি ইন্টালিজেন্স অফিসার মাঝে মাঝে দেখা করতে আসতেন৷ আলোচনা প্রসঙ্গে উনি একদিন বললেন, আসামে ISI তার নেটওয়ার্ক ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু হিন্দুদের উপরে সংগঠিতভাবে কোন আক্রমণ যাতে না হয়, সে ব্যাপারে তারা কঠোর নির্দেশ দিয়েছে তাদের এজেন্টদের৷ তাদের পরিকলপনা, আসাম দখল করতে আর ডাইরেক্ট অ্যাকশন করার দরকার নেই৷ সেখানে হিন্দুদের উপরে বড় ধরণের কোন আঘাত হলে সারা ভারতের হিন্দুরা সচেতন এবং সতর্ক হয়ে যাবে৷ এতে তাদের বৃহত্তর পরিকল্পনা রূপায়নের কাজ কঠিন হয়ে যাবে৷ তাই আসাম দখল হবে, কিন্তু তার আঁচ বেশী লোকের গায়ে লাগবে না, কোন মিডিয়ায় প্রচার হবে না, লোকেরা গুরুত্ব দেবে না – সেই রকম একটা রণকৌশল তৈরী করে তার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছে ISI৷

এই প্রোজেক্টের নাম দিয়েছে LIC! মানে LOW INTENSITY CONFLICTS মানে ছোট ছোট সঙ্ঘর্ষ – ডাকাতি, রেপ, গণধোলাই, বাজার লুঠ ইত্যাদি৷ যেভাবেই হোক ঘটনাগুলোকে ছোট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, যার প্রভাব ছোট এলাকার মধ্যে প্রবল ভাবে পড়বে৷ এই সব ঘটনার খবর বেশী দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে না৷ যদিও পৌঁছায়, হিন্দুরা সেগুলোকে Law & order problem বা আইন শৃঙ্খলার অবনতি বলে বিশেষ গুরুত্ব দেবে না৷ মোটকথা, বৃহত্তর বিপদের কথা কোনভাবেই আঁচ করবে না এবং কেউ বুঝানোর চেষ্টা করলে বিশ্বাসও করবে না৷ কিন্তু যারা ভুক্তভোগী, তাদেরকে এবং এলাকার বাকী হিন্দুদেরকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হবে যে, এই ডাকাতি কিংবা রেপ হল ইসলামিক সন্ত্রাস৷ এখানেই এর শেষ নয়৷ এখানে থাকলে এধরণের ঘটনা বার বার ঘটবে৷ তাই মানে মানে এলাকা ছেড়ে পালাও৷ তোমার এই সম্পত্তি কিনে নেওয়ার লোক আছে, প্রয়োজনে বেশী দাম পাবে৷ সোজা কথায় পরিকলপনা হল আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ গ্রামের দখল নেওয়া৷

প্রথমত, এই একই পরিকল্পনার ছাপ কি আমরা পশ্চিমবাংলার বুকে রূপায়িত হতে দেখতে পাচ্ছি? মল্লিকপুর, উস্তি, জুরানপুর, হাঁসখালি, পঞ্চগ্রাম, বিকি হাকোলা, চন্ডিপুর, নৈহাটি, গয়েশপুর, বাঁশবেড়িয়া, ধুলাগড়, বসিরহাট – একের পর এক সন্ত্রাসের ঘটনা কিসের ইঙ্গিত বহন করছে? কামদুনী থেকে শুরু করে রূপনগর-তারানগর, নোরিট, নির্মাণ দত্তপাড়ার ধর্ষণের ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনারূপেই থেকে যায় নি? হিন্দু সংহতি না থাকলে তো বেশীরভাগ ঘটনার খবরই কেউ জানতে পারতো না!

দ্বিতীয়ত, এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করছে কারা? পাকিস্তান আর বাংলাদেশ লোক পাঠাচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে যাদেরকে পাঠাচ্ছে, তাদেরকে এলাকার পথঘাট চেনাচ্ছে কারা? ঘরভাড়া করে দিচ্ছে কারা? পুলিশ-গোয়েন্দাদের থেকে আড়াল করে রাখছে কারা? সন্ত্রাসবাদী প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র মজুত করার জায়গা দিচ্ছে কারা? মল্লিকপুর থেকে বসিরহাট – হিন্দুদের উপরে যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তারা কি পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ থেকে আমদানী হওয়া সন্ত্রাসবাদী? এই সমস্ত প্রশ্ন কিন্তু অনেকেই বিব্রত হবেন৷ কারণ শাক দিয়ে মাছ ঢাকা দেওয়া আর তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না৷ এইভাবেই দুই ২৪ পরগণা, নদীয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদ, উঃ দিনাজপুর, বীরভূম – জেলাগুলিতে জনসংখ্যার ভারসাম্যের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়ে গেছে৷ ওই জেলাগুলোতে প্রতিদিন হিন্দুরা সব ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ হিন্দুরা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছে৷ বাকী যে জায়গার মুসলমানরা সংখ্যায় এবং শক্তিতে critical mass এ পৌঁছাতে পারে নি, তারা হিন্দুদের সঙ্গে “একই বৃন্তে দুটি কুসুম” হয়ে বসবাস করছে৷ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঝান্ডা উড়িয়ে রেখেছে সযত্নে৷ তারা যে অপেক্ষা করছে ৩০% এর বেঞ্চমার্ক ছোঁয়ার জন্য, সেটা সেখানকার হিন্দুরা বুঝতে পারছে না৷ যখন বুঝবে তখন সময় পেরিয়ে যাবে৷

বন্ধু প্রত্যুষ আর আমি কুচবিহার স্টেশনের বাইরে খিচুড়ি খাচ্ছিলাম৷ গরম খিচুড়ি, খাওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই৷ হঠাৎ দেখলাম প্রত্যুষ কিন্তু প্রায় শেষ করে ফেলেছে৷ ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,’আপনি খিচুড়ি খাওয়ার টেকনিক জানেন না৷ গরম খিচুড়ি সাইড থেকে খেতে খেতে মাঝখানে আসতে হয়৷’ সত্যিই আমি জানতাম না, অনেকেই জানেন না৷ তবে মুসলমানরা যে গরম খিচুড়ি খাওয়ার টেকনিকটা ভালো জানে, তা পরিস্থিতি দেখেই বোঝা যাচ্ছে

ভারতে গোহত্যা- শুধুই কি খাওয়ার জন্য?

গরু কে কেউ মা বললেও যেমন আমার আপত্তি নেই, আবার গরুকে কেউ নিছক খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করলেও আমার কোন আপত্তি নেই৷ কারণ শ্রদ্ধা মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে তৈরী হয়৷ এই বিশ্বাস কতটা যুক্তিপূর্ণ সেটা সেই বিশ্বাসী ব্যক্তির মানসিক গঠন, তার শিক্ষা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির গতি প্রকৃতির বিষয়ে তার knowledge এবং observation ইত্যাদির উপরে নির্ভর করে৷ কিন্তু যতই অযৌক্তিক মনে হোক না কেন, যে কোন কিছু বিশ্বাস করার পূর্ণ স্বাধীনতা মানুষের আছে যতক্ষণ না তার সেই বিশ্বাস অন্যের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে, তার বিশ্বাস সমাজ এবং প্রাকৃতির ভারসাম্যকে নষ্ট করছে৷ দেশ, জাতি তথা বিশ্বমানবতার স্বার্থের পরিপন্থী না হওয়া পর্যন্ত কোন ব্যক্তির বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই৷ তবে মানুষের বিশ্বাস নিশ্চই যুক্তি নির্ভর হওয়া উচিত৷ পাশাপাশি সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও কিছু কিছু বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা মানুষের মনে পরম্পরাগতভাবে তৈরী হয়ে থাকে, হয়তো তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে আছে৷

আমি সুনামীর পরে লিটল আন্দামানে গিয়েছিলাম৷ সেখানে স্থানীয় বাসীন্দাদের মধ্যে একজন তার অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে বললেন, কয়েক পুরুষ ধরে সেখানকার অধিবাসীদের বিশ্বাস, সমুদ্র যখন দূরে সরে যায় তখন মানুষেরও উচিত সমুদ্র থেকে দূরে সরে যাওয়া৷ সুনামীর ঢেউ যখন আছড়ে পড়ল, ঠিক তার আগে সমুদ্রের জল অনেক দূরে পিছিয়ে গিয়েছিল৷ বিশ্বাসের ভিত্তিতে যারা তা দেখে তখন সমুদ্র থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, তারা বেঁচে গিয়েছিলেন৷ আর যারা এই বিশ্বাসকে কুসংস্কার মনে করে তাচ্ছিল্য করেছিলেন, তারা আজ আর বেঁচে নেই! অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না জানলেও অভিজ্ঞতা ও observation এর ভিত্তিতে যে বিশ্বাস তৈরী হয়, তা নিশ্চই উপহাসের বিষয় হতে পারে না৷ গরুকে মা বলতে অস্বীকার করার অধিকার আমার আছে৷ কিন্তু কেউ যদি গরুকে মা বলে বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা করে – তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাটাকে আমি কোনভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে করি না৷ এটাও এক ধরণের সঙ্কীর্ণ মানসিকতার লক্ষণ৷

দ্বিতীয় বিষয় খাদ্যাভ্যাস৷ মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরী হয় মূলতঃ খাদ্যের খাদ্যগুণ এবং তার availability র উপরে ভিত্তি করে৷ মানুষ সব সময় সস্তায় পুষ্টিকর খাবার খোঁজে৷ যে খাবার যত বেশী available, তার দাম তত কম৷ আমরা ছোটবেলায় পাঁঠার মাংসই বেশী খেতাম৷ ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকল, দেশী মুরগী সেই জায়গা দখল করতে লাগলো৷ প্রথম প্রথম মুরগী সাধারণ হিন্দু পরিবারগুলোতে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷ অনেক বাড়ীতে আলাদা বাসন ছিল মুরগী রান্না করার জন্য! পুরোনো লোকেরা বলতেন – মুরগী ম্লেচ্ছদের খাবার! এখনকার প্রজন্ম ভাবতে পারে এসব কথা? পরে পোল্ট্রি চলে এলো৷ ইদানীং শুকরের মাংসও ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে৷ আমার বলার বিষয় হচ্ছে খাদ্য নির্বাচনের এই বিবর্তন একটা natural process ৷ এ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, আজ কেউ কি বলতে পারে?

এখন এই খাদ্য নির্বাচনের সময় আরও কিছু বিষয় বিচার্য থেকে যায়৷ সেগুলো হল বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য ঠিক থাকছে কি না, আমরা খেয়ে খেয়েই অনেক প্রজাতির পশুকে পৃথিবী থেকেই বিলোপ করে দিতে চলেছি কি না, কোন পশুর মাংস হিসাবে পেটে যাওয়ার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অন্য বিশেষ উপযোগিতা আছে কি না? ইত্যাদি বিচার করে পশুহত্যা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের৷ কারণ সরকারের হাতে  উপরোক্ত বিচার্য বিষয়গুলোর সঠিক অধ্যয়ন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য মেশিনারি আছে৷ আমাদের বাজারে আগে কচ্ছপের মাংস বিক্রি হত, আজকে তা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ৷ হরিণের মাংস, বুনো শুয়োরের মাংসের স্বাদ থেকে সরকার আমাদের বঞ্চিত করেছে৷ আমরা কিন্তু মেনে নিয়েছি৷

কিন্তু দেখা যাচ্ছে ভারতে গোহত্যার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট সহ একাধিক হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা জারী করা সত্ত্বেও তাকে সম্পূর্ণভাবে অমান্য করা হচ্ছে৷ কোনও ধর্মীয় ground এ এই নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে তা নয়৷ দুধ সরবরাহ এবং কৃষিকাজের ক্ষেত্রে আজও গরুর উপযোগিতা অনস্বীকার্য৷ তাই গরুকে সম্পদ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে গোসম্পদ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত৷ West Bengal Animal Slaughter Control Act, 1950 অনুসারে পশ্চিমবঙ্গেও প্রজননে, কৃষিকাজে সক্ষম ও ১৪ বছরের কম বয়সী গরুকে হত্যা করা নিষিদ্ধ৷ তা সত্ত্বেও বাস্তবে কি ঘটে চলেছে তা আমাদের কারো অজানা নয়৷ ধর্মের নাম দিয়ে আদালতের অবমাননা করা হচ্ছে বুক ঠুকে! ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ভারতের শিশুদের গোদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে বিনা বাধায়!

কৃষিকাজে মুসলমানরা কি গরু ব্যবহার করে না? করে৷ মুসলমান শিশুরা কি গরুর দুধ খায় না? খায়৷ গোসম্পদ সংরক্ষণ হলে কি শুধু হিন্দুদেরই লাভ হবে? নিশ্চই না৷ তা সত্ত্বেও গরু কাটার প্রতি এত আগ্রহ কেন মুসলিম সমাজের? কারণ হিন্দুদের উপরে নিজেদের সুপ্রীমেসিকে প্রতিষ্ঠিত রাখা৷ শক-হূণেরা ভারতে এসে একদেহে লীন হয়ে যেতে পারলেও পাঠান-মোগলরা পারে নি৷ কোনদিন পারবেও না৷ কারণ ইসলামের কোর্ হচ্ছে seperatism! তারা পৃথিবীর কোন দেশে গিয়ে মূল সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে নি৷ তাদের মুখে সর্বত্র একই দাবি – আলাদা স্টেটাস চাই৷ আলাদা আইন, আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা, আলাদা ভাষা, আলাদা পতাকা ……… আলাদা দেশ!

কেউ সাধারণভাবে গরু খেলে আমার কোন আপত্তি নেই৷ উত্তর পূর্বাঞ্চলের অনেক জনগোষ্ঠীর সাথে গভীর ভাবে মিশে দেখেছি তারা সবদিক দিয়ে হিন্দু হলেও গরু খায়৷ এতে তাদের হিন্দুত্ব বিন্দুমাত্র ফিকে হয়ে যায় বলে আমি মনে করি না৷ তারা এই দেশকে ভালোবাসে, দেশের অখন্ডতা রক্ষায় জীবন দেওয়াকে তারা ধর্ম মনে করে৷ তাই গরু খেলেও কিছু এসে যায় না৷ কিন্তু ভারতের বৃহত্তম হিন্দু সমাজের moral down করার উদ্দেশ্য নিয়ে, ভারতের সংবিধান ও আইনকে অপমানিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে, ভারতের বুকে বসে seperatism এর ভাবনাকে জাগিয়ে রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে গোহত্যা করার প্রবণতা মুসলমানদের ত্যাগ করা উচিত৷ 

পরিশেষে সেকু-মাকু ভাইদের কাছে বিনম্র নিবেদন, মুসলমানদের এই গোহত্যা করার আগ্রহের পিছনে motive টাকে অনুধাবন করুন৷ এদের সমর্থন করার অর্থ হচ্ছে ভারত ভাঙার চক্রান্তকে সমর্থন করা৷ এদের শক্তিবৃদ্ধি করার অর্থ হচ্ছে সেকুলারিজমকে হত্যা করা, লিবারালিজমকে ধ্বংস করা৷ রুশদী, তসলিমা, হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে সম্প্রতি নিহত মুক্তমনা ব্লগারদের পরিণতির কথা ভাবুন৷ যে কোন এলাকার সেকুলার, লিবারাল পরিবেশ সেখানকার মুসলিমদের শক্তির সাথে inversely proportional! মানলাম আপনারা শিক্ষিত, চাড্ডিরা অশিক্ষিত৷ কিন্তু মাঝনদীতে ঝড় উঠলে সেই অশিক্ষিত মাঝিই কিন্তু আপনাদের মত বিদ্যেবোঝাই বাবু মশাইদের পরিত্রাতা, সেই অশিক্ষিত চাড্ডিরা গদা হাতে না দাঁড়ালে মুক্তমনা ব্লগারদের মত আপনাদের জীবনটাও যে ষোল আনাই মিছে এটা ভুলবেন না৷

শ্রীরামচন্দ্র কি দলিত বিরোধী ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতীক?

রামচন্দ্র দলিত বিরোধী ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতীক। দলিতদের তাই রামের পূজার বদলে রাবণের পূজা করা উচিৎ’ – অনেকদিন ধরেই এই ধরণের ন্যারেটিভ নামিয়ে হিন্দু সমাজকে বিভাজিত করার চেষ্টা করেছে দলিত-মুসলিম ঐক্য ব্রিগেড এবং বামৈস্লামিক আঁতেলরা। অনেক জায়গায় এদের উদ্যোগে রাবণপূজাও ঘটা করে করা হয়েছে এবং তার প্রচার করা হয়েছে তার চেয়েও বেশি ঘটা করে। কিন্তু তাতে ডাল গলে নি। শ্রীরামের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি একফোঁটাও কমেনি জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দুর মনে। এখন আবার নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে- রামমন্দিরের ভূমি পূজার জন্য অযোধ্যায় মতুয়াদের পক্ষ থেকে কেন মাটি যাবে? এই প্রসঙ্গে কয়েকটা কথা সোজাসুজি বলা দরকার।

প্রথমত, ভগবান রামচন্দ্র ব্রাহ্মণ ছিলেন না, বরং ব্রাহ্মণ ছিলেন রাবণ। তাই রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ বধ দলিতের উপরে ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচার- একথা ধোপে টেকে না।

দ্বিতীয়ত, বনবাসে থাকাকালীন রামচন্দ্র যাঁদের সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে গুহক রাজা (যিনি জাতিতে ছিলেন চন্ডাল), মাতা শবরী ( যিনি জাতিতে ছিলেন শবর) উল্লেখযোগ্য। এঁদের এবং রামচন্দ্রের মধ্যে পারস্পরিক যে সম্পর্কের বর্ণনা রামায়ণে আছে, তাতে এঁদের প্রতি রামচন্দ্রের মনে গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার ছিল এবং পক্ষান্তরে তাঁদের মনেও শ্রীরামের প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা; এবিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

তৃতীয়ত, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিযানে রামচন্দ্রের সাথে কতজন উচ্চবর্ণের লোক ছিলেন বলতে পারেন? তাঁর সৈন্যদল ছিল বনবাসী, গিরিবাসীদের নিয়ে তৈরি। এদেরকেই তো দলিত বলা হয়, তাই নয় কি? তাহলে দেখা যাচ্ছে সৈনিকরা তথাকথিত দলিত সম্প্রদায়ের, সেনাপতির ভুমিকায় তথাকথিত দলিতরা এমনকি শ্রীরামের শ্রেষ্ঠভক্ত হনুমান একজন বনবাসী অর্থাৎ তথাকথিত দলিত। আর সবাই মিলে যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে, সে হল একজন ব্রাহ্মণ!

আসলে ‘দলিত-মুসলিম ঐক্য’ ব্রিগেড এবং বামৈস্লামিক আঁতেলদের এই বিষয়ে আর একটু ওয়ার্ক আউট করে মাঠে নামা উচিৎ ছিল। হিন্দুরা আগের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশী সচেতন। ইন্টারনেটের যুগে একজন সাধারণ হিন্দুও জানে রামমন্দির নির্মাণের জন্য যে ট্রাস্ট তৈরি হয়েছে তাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে একজন তথাকথিত দলিত আছেন, যিনি রামমন্দিরের শিলান্যাসের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। তাঁর নাম কামেশ্বর চৌপাল। এছাড়াও আপনাদের হয়তো মনে আছে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পরে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে উত্তরপ্রদেশের সরকারকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সরকারের মাথায় যিনি ছিলেন তাঁর নাম কল্যাণ সিং। আপোষহীন এই তথাকথিত দলিত ভদ্রলোক সেদিন নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারের বলিদান দিয়েছিলেন শ্রীরামের চরণে। তাই যুক্তিহীন মনগড়া ন্যারেটিভ নামিয়ে আর হিন্দুদের আর বোকা বানানো যাবে না। রামের নামে জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দুরা আগেও একত্রিত ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।

মতুয়া সমাজের প্রতিষ্ঠাতা ঠাকুর হরিচাঁদ, পরবর্তীতে ঠাকুর গুরুচাঁদ এবং শ্রী প্রমথনাথ ঠাকুর হিন্দু সমাজে কালের প্রভাবে সৃষ্টি হ‌ওয়া সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে শোষিত নিপীড়িত মানুষদের সংগঠিত করেছিলেন, তাঁদের উত্থানের প্রয়াস করেছিলেন, কিন্তু কখনোই নিজেদের হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন নি। তাই মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামের মন্দিরের জন্য মতুয়াদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করাই স্বাভাবিক। হিন্দু সমাজের মধ্যে একাত্মতা নির্মাণে সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মতুয়া সমাজের বর্তমান নেতৃত্বকে হিন্দু সংহতির পক্ষ থেকে সাধুবাদ জানাই।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক যুদ্ধই হল ধর্ম

একটা বিশাল প্রাণীকে কাবু করে ফেলার পরেও অজগর কিন্তু একবারে সেটাকে গিলে খেতে পারে না৷ ক্ষমতা এবং ক্ষুধা অনুযায়ী একটু একটু করে গিলতে থাকে ৷ খাওয়া কতদিনে শেষ হবে তা নির্ভর করে শিকারের সাইজের উপরে এবং শিকারীর হজম ক্ষমতার উপরে৷ শিকারের ছটফটানি দেখে কেউ বলে যে এখনও ধড়ে প্রাণ আছে, এখনও লড়াই করছে, এখনও আত্মসমর্পণ করে নি; সুতরাং যুদ্ধ শেষ হয় নি৷ তাহলে সে টেকনিক্যালি একশো শতাংশ সত্যি কথা বললেও সেই কথা কারো মনে এই আশা জাগাবে না যে, শেষ পর্যন্ত সেই শিকার অজগরের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে৷

মুসলিম আগ্রাসনের শিকার আমাদের হিন্দু সমাজের অবস্থা আজ সেই অজগরের গ্রাসে আবদ্ধ অসহায় প্রাণীর মত। সুদীর্ঘ লড়াইয়ের পর আজকে যদি আমরা হিসাবে বসি, তাহলে দেখবো আমাদের মাটি গেছে, দেশ ছোট হয়েছে৷ আমাদের মানুষ ধর্মান্তরিত হয়ে সমাজ ছেড়ে চলে গেছে, সমাজ ছোট হয়েছে৷ রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও হিন্দুর ধর্মীয় স্বাধীনতা লুন্ঠিত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে৷ আজও বাংলার গ্রামেগঞ্জে জমি দখল চলছে অবাধে৷ হিন্দু মেয়েদের ছলে-বলে-কৌশলে হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে লাভ জেহাদের মাধ্যমে৷ হিন্দু সংখ্যালঘু এলাকাগুলিতে হিন্দুর ধর্মাচরণ সংখ্যাগুরুদের অনুমতি সাপেক্ষ৷ ভারতের ইসলামীকরণ চলছে নিজের গতিতে৷ আফগানিস্তান গেছে, পাকিস্তান গেছে, গেছে সোনার বাংলা৷ ভূস্বর্গ কাশ্মীর থেকেও নেই৷ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম যাওয়ার পথে৷ সম্পূর্ণ ভারতের ইসলামীকরণ শুধু সময়ের অপেক্ষা৷

আজকে  ভারতে যে মুসলমানদের দেখতে পাচ্ছি, তাদের সিংহভাগই তো হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত৷ সুদীর্ঘ মুসলিম শাসনে যারা ভয়ে অথবা স্বার্থের লোভে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল, তাদেরই বংশধর৷ আর ভারতের হিন্দুদের বর্তমান প্রজন্ম হল সেই সব বীর এবং ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিদের উত্তরসূরী, যাঁরা সেই সময় শাসক মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছেন কিন্তু ধর্মত্যাগ করেন নি৷ কিন্তু আজকে আমরাই মুসলিম আগ্রাসনের সামনে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ছি৷ তাদের অন্যায়, অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে সাহস করছি না৷ বরং কোন সাহসী হিন্দু রুখে দাঁড়ালে, তাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করার পরিবর্তে তাকেই উল্টে দোষারোপ করছি৷ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় হিন্দুরা নরকযন্ত্রণা ভোগ করেও অত্যাচারী মুসলমানদের সাথে আপোষ করে থাকাকেই নিরাপদ বলে মনে করছে৷ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা, হিন্দুর এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থরক্ষার কথা বলতে গেলে এই অত্যাচারিতরাই বলে,”আপনারা এখানে আসা যাওয়া না করলেই আমরা ভালো থাকবো”৷ আর যেখানে মুসলিম সমস্যা এখনও প্রকট হয়ে ওঠে নি, সেখানকার হিন্দুরা উদাসীন৷

এই ক্লীবতা, কাপুরুষতা, জড়তা, সংবেদনহীনতাকে সম্বল করে শুধু প্রাচীন গৌরবগাথা গেয়ে কোন জাতি টিকে থাকতে পারে না৷ হিন্দুকে যদি অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়, তবে এই জড়তাকে ঝেড়ে ফেলে মাথা উচু করে দাঁড়াতে হবে৷ চাই একটা মরিয়া প্রয়াস৷ যেখানেই একজন হিন্দুর উপরে অত্যাচার হবে, প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে হবে৷ প্রতিকার করতে হবে তৎক্ষণাৎ৷ সাপ ফণা তোলার সাথে সাথে থেঁতলে দিতে হবে সেই ফণা ৷ তবেই হিন্দু বাঁচবে, দেশ বাঁচবে৷ মনে রাখতে হবে অন্যায়ের সাথে আপোষ করে শান্তিলাভ করা যায় না৷ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় অন্যায়ের বিনাশ হলে৷ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আঠারো অধ্যায় ধরে অর্জুনকে এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন৷ অধর্মের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াইয়ের বার্তাই হল গীতাসার৷ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক যুদ্ধই হল ধর্ম৷ বাঁচার অন্য কোন পথ নাই৷ তাই রাসবিহারী বোস, বিনয়-বাদল-দীনেশদের এই মাটিতে আজ আবার ধ্বনিত হোক-

"এসেছে সে এক দিন

লক্ষ পরাণে শঙ্কা না মানে, না রাখে কাহার ঋণ

জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য

চিত্ত ভাবনাহীন৷৷"

সীমাবদ্ধ একতাই শক্তি

কোন একটা সুস্পষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে যখন আপনি এগিয়ে যাবেন, তখন সমমনস্ক ব্যক্তিরা আপনাকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবে। এই সমস্ত লোকেদের ত্যাগ তিতিক্ষা আপনার মিশনের শক্তি বাড়াবে। এইভাবে আপনার মিশন ক্রমশঃ প্রচার ও পরিচিতি লাভ করবে। এইবার আপনার এই ক্ষমতা ও শক্তিকে দেখে লোকেরা আপনার সাথে যুক্ত হতে চাইবে।

বাঙালি হিন্দুর মানসিকতার অনুভব এবং কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যারা এইভাবে এগিয়ে আসে তাদের বেশীর ভাগই সমস্যায় পড়ে তার সমাধানের জন্য আপনার শক্তি ও ক্ষমতাকে ব্যবহার করার মানসিকতা নিয়ে আসে। নিজের স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে যোগাযোগ রাখে না। আর সমাধান না হলে সংগঠনকে গালমন্দ করে। এরা এখানে আসে হাত পেতে।

সবাই ধান্দাবাজ নয়। কিছু লোক আসে শেলটার বা প্রোটেকশন পাওয়ার আশায়। তারা সংগঠনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু without any contribution! আপনার নাম ভাঙিয়ে তারা নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে চায়। কিন্তু আপনার মিশনের অগ্রগতির সাথে এদের কোন লেনাদেনা নেই। খালি স্তুতি আর প্রশংসার গ্যাস বেলুন ছাড়া এদের কাছে পাওয়ার কিছু নেই।পাশাপাশি সীমিত লোক আসে হাত উপুড় করে। আপনার মিশনকে নিজের মিশন মনে করে তাকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য উজাড় করে দিয়ে যেতে আসে। এরাই অ্যাসেট।

এইবার আপনি ভাবুন একতা একতা করতে গিয়ে আপনি যদি বহুসংখ্যক লেনেওয়ালা আর অল্পসংখ্যক দেনেওয়ালাকে একসাথে নিয়ে চলতে চান, আপনার মিশনের ভবিষ্যত কি হবে? তাই আপনার মিশনকে সাফল্যের মুখ দেখাতে হলে আপনাকে এই ট্র্যাডিশনাল একতার ভাবনা থেকে শত হাত দূরে থাকতে হবে। আপনাকে ফিল্টার অ্যাপ্লাই করতে হবে। দেনেওয়ালা অল্পসংখ্যক লোকদেরকে অ্যাসেট মনে করতে হবে। এদেরকে আহ্বান করতে হবে। এদেরকে বুক দিয়ে আগলে রাখতে হবে। একতার ভাবনাটাকে এই গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। আর বাকীদেরকে সচেতনভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। কারণ এরা লায়াবিলিটি। এরা আপনাকে পিছনে টেনে ধরে রাখবে, আর use করবে।

আজ আমাদের সমাজের মানসিকতার পরিপ্রেক্ষিতে আমার স্পষ্ট মত – সার্বিক একতা শক্তি নয়, লায়াবিলিটি। তবে দেনেওয়ালাদের মধ্যে একতা অবশ্যই শক্তি এবং এই Restricted বা সীমাবদ্ধ একতা একান্ত কাম্য।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে হিন্দুরা আর কতদিন

অযোধ্যার রামমন্দির হিন্দুদের আবেগের প্রতীক।প্রত্যেক শুক্রবার, বিশেষতঃ ঈদের দিন আনলক রেখে বিচ্ছিন্নভাবে ৫ই আগস্ট, রামমন্দিরের ভূমিপূজনের দিনটাতে লকডাউন ঘোষণা করে এই সরকার সরাসরি হিন্দুদের আবেগে আঘাত করেছে। এটা কি ঠিক তোষণ? না কি এটা তোষণের পরবর্তী পর্যায়? তৃণমূলের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে তাদের রাজনৈতিক শত্রুতা হল বিজেপির সাথে, ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের সাথে নয়, এমনকি রামভক্ত হিন্দুদের সাথেও নয়। শাসকদলের এই সমস্ত সিদ্ধান্ত দেখে মনে হচ্ছে তৃণমূল দলটার লড়াই যেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিরুদ্ধে এবং তাঁর ভক্তদের বিরুদ্ধে! যত দিন যাচ্ছে এই দলটা শুধুমাত্র মুসলিম তোষণকারী হিসেবে নয়, হিন্দুর শত্রু হিসেবেই যেন নিজেকে চিহ্নিত করে ফেলছে। এই হিন্দু বিরোধী তকমা ঝেড়ে ফেলতে হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে, এবং সেটাও খুব কম সময়ে। আর উনি এবং ওনার দল যদি বিজেপি বিরোধিতা করতে গিয়ে গোটা হিন্দু সমাজের বিরোধী অবস্থানে নিজেদের নিয়ে চলে যান তবে ২০২১শে তাদের মহাবিপর্যয় সুনিশ্চিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে রাখা উচিৎ, সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক এখনও হিন্দুরাই, মুসলমানরা নয়। তাই হিন্দুর আবেগকে আহত করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না।

কিন্তু এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভোটের এবং ২০২১শে ক্ষমতা দখলের প্রধান দাবিদার বিজেপির পক্ষ থেকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ, এমনকি সমালোচনা পর্যন্ত চোখে পড়ছে না কেন? হিন্দুর আবেগ আহত হলে তাদের কিছু যায় আসে না? বঙ্গবিজেপি কি হিন্দুদের ভোটকে Taken for granted ধরে নিয়েছে?

‘হিন্দু ব্যাটারা আর ভোট দেবে কাকে’? ‘বিজেপি ছাড়া বিকল্প আর জায়গা কোথায়’? হিন্দু সংগঠনগুলো তো আছেই চেচামেচি করার জন্য। আর আমরা আছি ফ্রি-তে তার লাভ নেওয়ার জন্য! তাই চুপচাপ থাকাই ভালো। আর হিন্দু সংগঠনগুলো বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেললে সহজেই স্টেটমেন্ট দিয়ে দেওয়া যাবে- ”ওদের সাথে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। ওরা গুন্ডা বদমাইশদের দল”….. ইত্যাদি ইত্যাদি। তাতে মুসলিম ভোটারদের সামনেও নিজেদের সেকুলার ইমেজটা বজায় থাকে। কারণ ওদের ভোট না পেলে পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা দখল করা অসম্ভব- বঙ্গবিজেপির নেতৃত্বের ভাবনাটা এইরকম নয়তো? এই ভাবনা নিয়েই যদি তারা চলে, তাহলে বিজেপি এই রাজ্যে ক্ষমতায় এলেও হিন্দুর কোনও লাভ হবে না। কারণ ক্ষমতায় এলেও এরা হিন্দুর আবেগকে মর্যাদা দেবে না।

মুসলমানরা শাসক দলকেও কব্জায় রেখেছে, পাশাপাশি ক্ষমতার দাবিদার বঙ্গবিজেপিকে মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের লোভ দেখাতেও সফল হচ্ছে।

আর হিন্দুরা? ……একটু গভীর ভাবে ভাবুন… নিজেকে প্রশ্ন করুন… নিজেদের ভোটের মূল্য না বুঝলে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দর কষাকষি করতে না পারলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে হিন্দুরা আর কতদিন বসে থাকতে পারবে? এই ”কতদিন”- এর কাউন্ট‌ই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ও বাঙ্গালীর অস্তিত্বের সময়সীমা।

পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যত হোক পশ্চিমবঙ্গই – পশ্চিম বাংলাদেশ নয়

আজকেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ইন্দিরা আবাস, বেকার ভাতা, বিধবা ভাতা, বিপিএল কার্ড, ব্যাঙ্ক লোন থেকে শুরু করে সবুজায়ন – শিল্পায়ন – রাস্তাঘাট – কর্মসংস্থান অর্থাৎ ব্যক্তিগত এবং কিছুটা সমষ্টিগত উন্নতির চার দিকে আবর্তিত হচ্ছে৷ স্বাভাবিক অবস্থায় এটাই কাম্য৷ কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এর পরিণাম সম্পর্কে উদাসীনতা দেখে মনে হচ্ছে আমরা বাড়িতে টাকা-পয়সা, সোনাদানা, দামী আসবাবপত্র সংগ্রহ করার নেশায় বাড়িতে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় শক্ত দরজা জানলা লাগানোর কথাটা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি৷ আমরা ঘরপোড়া গরু, কিন্তু সিঁদুরে মেঘ দেখেও না দেখার ভান করছি৷ যেদিন ধর্মের ভিত্তিতে বঙ্গদেশ ভাগ হয়েছিল, সেদিন কি শুধু অধুনা পূর্ববঙ্গের বাঙালী হিন্দুর পরাজয় হয়েছিল? আমরা, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরাও কি সেদিন সেই ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদের সামনে আত্মসমর্পণ করি নি? ইদানীং পশ্চিমবঙ্গের ২৭% মুসলিমদের পক্ষ থেকে মুসলিম নেতারা ৪৮টি বিধানসভা সিটের ভাগ্যবিধাতা বলে নিজেদের ঘোষণা করে কি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন? নাকি এই চ্যালেঞ্জটা আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসী বাঙালীর সামনে? আগামী পাঁচ বছর পরেও কি সংখ্যাটা ৪৮ই থাকবে? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামের পাশে কোন হিন্দু পদবী আর কতদিন শোভা পাবে? এই সব প্রশ্নের শেষ কোথায়? শেষ প্রশ্নগুলি অবশ্যই এই রকম – পশ্চিমবঙ্গ কবে কাশ্মীরে পরিণত হবে? পশ্চিমবঙ্গ কবে হিন্দুবিহীন হবে? পশ্চিমবঙ্গ কবে বাংলাদেশ হয়ে যাবে?


মোদ্দা কথা অধিকাংশ বাঙ্গালী ভয়ে এই সব প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছে৷ মানসিক ভাবে তারা হার মেনে নিয়েছে৷ না হলে বেড়া না দিয়ে সব্জী চাষ করার মত নির্বোধের কাজ অন্তত বাঙ্গালী বুদ্ধির সাথে ম্যাচ করে না৷ সাহস অবলম্বন করুন৷ আসুন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের কথা ভেবে কিছুদিনের জন্য ইন্দিরা আবাস আর চাকরীর কথা ভুলে যাই৷ আপনার আজকের নীরবতা আপনার সন্তানকে প্রতিদিন একটু একটু করে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আসুন, শপথ করি- পশ্চিমবঙ্গকে কাশ্মীর হতে দেব না৷ পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাঙালীয়ানাকে হারিয়ে যেতে দেব না৷ জলকে জল না বলে পানি বলার মত পরিস্থিতি হতে দেব না৷ আমরা স্নান করবো, গোসল করতে বাধ্য হব না৷ আমরা যদি চেক লুঙ্গি পরি, সেটা পরবো নিজের ইচ্ছায়, বাধ্য হয়ে নয়৷

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে পৌষ মেলা হবে, চড়কপূজা হবে৷ মা কালী পাঁঠার মাথা খাবে, বুড়ো শিব ডুগডুগি বাজাবে৷ মা দুর্গাকে বিদায় দিতে গিয়ে দশমীর দিন আমার মায়েরা চোখের জল ফেলবে৷ লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে আমার বোনেরা সরস্বতী পূজো করবে, কালো বোরখার অন্ধকারে তারা হারিয়ে যাবে না৷ বাঙ্গালীর মনে বীরভূমের বাউল, মালদার গম্ভীরা আর পুরুলিয়ার ছৌ-নৃত্যের স্থান আলকাফ আর জালসা কোনদিন নিতে পারবে না – চলুন, এই স্বপ্ন নিয়ে সব নেতাদের কাছে একবার আমরা যাই৷ চলুন জেনে আসি কে পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গই রাখতে চায়৷ তারপরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি আমার পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে বিধানসভা পর্যন্ত সমস্ত ক্ষমতা আমরা কাদের হাতে তুলে দেব৷ পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যত হোক পশ্চিমবঙ্গই – পশ্চিম বাংলাদেশ নয়৷

আইডেনটিটির ইস্তেমাল

মনে করুন বাংলাদেশের এক‌ই গ্রাম থেকে দুজন মুসলমান ভারতে ঢুকলো। একজন গেলো আসামের অহমীয়া প্রধান জোরহাটে, অন্যজন সেই আসামের‌ই বাঙালি অধ্যুষিত হাইলাকান্দিতে।
প্রথম জন নিজের পরিচয় দেবে – আমি একজন অহমীয়া। ভাঙাফাটা অসমীয়া ছাড়া কখনোই সে বাংলায় কথা বলবে না। বাঙালি দেখলে বলবে কেলা বঙ্গালি। সে তাম্বুল পান খাবে। বিহুতে আনন্দ করবে। তার বাংলাদেশী পরিচয় লুকিয়ে তখন সে একজন ভূমিপুত্র অহমীয়া।


দ্বিতীয় জন কাঁচা কাছাড়ি ভাষায় কথা বলবে।  জনগণনার সময় নিজের পরিচয় নথিভুক্ত করাবে বাঙালি হিসেবে। সে তাম্বুলের পরিবর্তে সাদার গুড়া(তামাক পাতার গুড়ো) দিয়ে পান খাবে। বিহুর পরিবর্তে সে গাইবে – কে যাস্ রে ভাটিগাঙ্ বাইয়া….., সে নাচবে ধামাইল। সে একজন আদ্যোপান্ত বাঙালি হয়ে প্রতিদিন অবাঙালিদের বাপ বাপান্ত করবে ।


আসলে তারা অসমিয়াও নয়, বাঙালিও নয়। পুরোটাই আইডেনটিটির ইস্তেমাল। এই গেমপ্ল্যানটা বুঝতে হবে। না বুঝলেই আবার রিফিউজি।