বঙ্গ, বাঙ্গালী এবং রামায়ণ (২)

রাম বহিরাগত, তার সাথে বাঙ্গালীর কী সম্পর্ক! এই বাংলায় রামের কোনও স্থান নেই – এই ধরণের কথাবার্তা বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সুকৌশলে। উদ্দেশ্য বাঙ্গালীকে বিভ্রান্ত করা, বৃহত্তর হিন্দু সমাজ থেকে এবং ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। এইভাবে অবশেষে বাঙ্গালীকে এবং আমাদের এই অবশিষ্ট বঙ্গভূমিকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে গ্রেটার বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা। এইভাবে ধীরে ধীরে আমাদের বাঙ্গালী আইডেনটিটিকে হাইজ্যাক করে বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বাটাকেই ধ্বংস করে দেওয়ার একটা গভীর চক্রান্ত চলছে। এটাকে প্রতিহত করতে হলে শুধুমাত্র জয় শ্রীরাম বলে স্লোগান দিলেই হবে না, যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে সত্যকে সকলের সামনে তুলে ধরতে হবে। এই তথ্য ষড়যন্ত্রীদের জন্য নয়, এগুলো মুক্তমনা যুক্তিবাদী বাঙ্গালী যুবসমাজের জন্য, যারা প্রকৃত সত্য জানতে এবং মানতে আগ্রহী। আসুন একটু তথ্যভিত্তিক আলোচনা করা যাক বঙ্গ এবং বাঙ্গালীর সাথে রামের সম্পর্ক আদৌ কতটা।

এই বঙ্গদেশে খ্রীষ্টিয় ষষ্ঠ শতকে (গুপ্তযুগে) গৌড়ীয় রামায়ণ রচিত হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য যে এই গৌড়ীয় রামায়ণই প্রথম ভারত থেকে ইউরোপে প্রেরিত হয়েছিল বলে জানা যায়। জার্মানির বন থেকে ১৮২৯-৩৮ খ্রীষ্টাব্দে এই গ্রন্থটি দুটি খন্ড প্রকাশিত হয়।

সম্পর্কিত বিযয়ঃ বঙ্গ, বাঙ্গালী এবং রামায়ণ (১)

খ্রীষ্টিয় নবম শতকে দেবপালের সময় গৌড় অভিনন্দ কর্তৃক রচিত হয় রামচরিত এবং খ্রীষ্টিয় দশম শতকে পালযুগেই মুরারী মিশ্র রচনা করেন অনর্ঘ রাঘব নামে একটি কাব্য-নাটক। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে মঞ্চস্থ করার জন্য এই কাব্য-নাটকটি রচিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এতে রামায়ণের বালকান্ড থেকে যুদ্ধকান্ড পর্যন্ত আছে। পরবর্তীকালে খ্রীষ্টিয় একাদশ শতকে রামপালের সময় সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিত বিশেষভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। এছাড়াও খ্রীষ্টিয় দ্বাদশ শতকে জনৈক কবি জয়দেব কর্তৃক রচিত হয় প্রসন্ন রাঘব। ইনি পীযূষবর্ষ উপাধি লাভ করেছিলেন।

১১৭৯ সালের আশেপাশে লক্ষ্ণণ সেনের সভাকবি এবং পঞ্চরত্নের এক রত্ন গোবর্ধন আচার্য্য আর্যা সপ্তশতী নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। শ্রী জাহ্নবী কুমার চক্রবর্তী এই প্রসঙ্গে বলেছেন, আর্যা সপ্তশতীর রামায়ণীয় প্রসঙ্গগুলিতে বাঙ্গালীর রামায়ণ চর্চার বৈশিষ্ট্যগুলি সুপরিস্ফুট। রামায়ণ চর্চায় বাংলাদেশ কোথাও সর্বাংশে বাল্মীকি রামায়ণের অন্ধ অনুকরণ করে নাই।ইহার বহু উপাদান অধ্যাত্ম রামায়ণ, পুরাণ বা লোকশ্রুতি হইতে সমাহৃত।…… দ্বিতীয়ত, গঙ্গা ঐরাবতকে ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিলেন এপ্রসঙ্গও বাল্মীকি রামায়ণে নাই। অধ্যাত্ম রামায়ণেও নাই। অথচ ইহা অতি সুপরিচিত কাহিনী। খুব সম্ভব কোন পুরাণ অথবা লোককাহিনী হইতে ইহা সংগৃহীত। আর্যার কাহিনী বাঙ্গালীর সংস্কার বিশ্বাসকেই অনুসরণ করিয়াছে।(আর্যা সপ্তশতী ও গৌড়বঙ্গ; রামায়ণ: প্রথম প্রকাশ ১৩৭৮, পৃষ্ঠা- ৮০)

১২০৬ খ্রীষ্টাব্দে সদুক্তি কর্ণামৃত গ্রন্থখানি সংকলন করেন লক্ষ্ণণ সেনের একজন সামন্ত শ্রী বটুদাসের পুত্র শ্রীধর দাস। এর পাঁচটি প্রবাহের মধ্যে দেবপ্রবাহে শ্রীরাম এবং বিরহী শ্রীরাম নামে দুটি কবিতা আছে। ১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দে সাগর নন্দী নামে একজন নাটক লক্ষ্মণ রত্নকোষ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙ্গালী নাট্যকারের রচিত নাটকের উল্লেখ আছে। এগুলির মধ্যে  রাম-বিক্রম, জানকীরাঘব, রামানন্দ, অযোধ্যা-ভরত, কৈকেয়ী-ভরত, বালিবধ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। (ক্রমশঃ)