শ্রীরামচন্দ্র কি দলিত বিরোধী ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতীক?

রামচন্দ্র দলিত বিরোধী ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতীক। দলিতদের তাই রামের পূজার বদলে রাবণের পূজা করা উচিৎ’ – অনেকদিন ধরেই এই ধরণের ন্যারেটিভ নামিয়ে হিন্দু সমাজকে বিভাজিত করার চেষ্টা করেছে দলিত-মুসলিম ঐক্য ব্রিগেড এবং বামৈস্লামিক আঁতেলরা। অনেক জায়গায় এদের উদ্যোগে রাবণপূজাও ঘটা করে করা হয়েছে এবং তার প্রচার করা হয়েছে তার চেয়েও বেশি ঘটা করে। কিন্তু তাতে ডাল গলে নি। শ্রীরামের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি একফোঁটাও কমেনি জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দুর মনে। এখন আবার নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে- রামমন্দিরের ভূমি পূজার জন্য অযোধ্যায় মতুয়াদের পক্ষ থেকে কেন মাটি যাবে? এই প্রসঙ্গে কয়েকটা কথা সোজাসুজি বলা দরকার।

প্রথমত, ভগবান রামচন্দ্র ব্রাহ্মণ ছিলেন না, বরং ব্রাহ্মণ ছিলেন রাবণ। তাই রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ বধ দলিতের উপরে ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচার- একথা ধোপে টেকে না।

দ্বিতীয়ত, বনবাসে থাকাকালীন রামচন্দ্র যাঁদের সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে গুহক রাজা (যিনি জাতিতে ছিলেন চন্ডাল), মাতা শবরী ( যিনি জাতিতে ছিলেন শবর) উল্লেখযোগ্য। এঁদের এবং রামচন্দ্রের মধ্যে পারস্পরিক যে সম্পর্কের বর্ণনা রামায়ণে আছে, তাতে এঁদের প্রতি রামচন্দ্রের মনে গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার ছিল এবং পক্ষান্তরে তাঁদের মনেও শ্রীরামের প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা; এবিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

তৃতীয়ত, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিযানে রামচন্দ্রের সাথে কতজন উচ্চবর্ণের লোক ছিলেন বলতে পারেন? তাঁর সৈন্যদল ছিল বনবাসী, গিরিবাসীদের নিয়ে তৈরি। এদেরকেই তো দলিত বলা হয়, তাই নয় কি? তাহলে দেখা যাচ্ছে সৈনিকরা তথাকথিত দলিত সম্প্রদায়ের, সেনাপতির ভুমিকায় তথাকথিত দলিতরা এমনকি শ্রীরামের শ্রেষ্ঠভক্ত হনুমান একজন বনবাসী অর্থাৎ তথাকথিত দলিত। আর সবাই মিলে যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে, সে হল একজন ব্রাহ্মণ!

আসলে ‘দলিত-মুসলিম ঐক্য’ ব্রিগেড এবং বামৈস্লামিক আঁতেলদের এই বিষয়ে আর একটু ওয়ার্ক আউট করে মাঠে নামা উচিৎ ছিল। হিন্দুরা আগের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশী সচেতন। ইন্টারনেটের যুগে একজন সাধারণ হিন্দুও জানে রামমন্দির নির্মাণের জন্য যে ট্রাস্ট তৈরি হয়েছে তাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে একজন তথাকথিত দলিত আছেন, যিনি রামমন্দিরের শিলান্যাসের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। তাঁর নাম কামেশ্বর চৌপাল। এছাড়াও আপনাদের হয়তো মনে আছে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পরে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে উত্তরপ্রদেশের সরকারকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সরকারের মাথায় যিনি ছিলেন তাঁর নাম কল্যাণ সিং। আপোষহীন এই তথাকথিত দলিত ভদ্রলোক সেদিন নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারের বলিদান দিয়েছিলেন শ্রীরামের চরণে। তাই যুক্তিহীন মনগড়া ন্যারেটিভ নামিয়ে আর হিন্দুদের আর বোকা বানানো যাবে না। রামের নামে জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দুরা আগেও একত্রিত ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।

মতুয়া সমাজের প্রতিষ্ঠাতা ঠাকুর হরিচাঁদ, পরবর্তীতে ঠাকুর গুরুচাঁদ এবং শ্রী প্রমথনাথ ঠাকুর হিন্দু সমাজে কালের প্রভাবে সৃষ্টি হ‌ওয়া সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে শোষিত নিপীড়িত মানুষদের সংগঠিত করেছিলেন, তাঁদের উত্থানের প্রয়াস করেছিলেন, কিন্তু কখনোই নিজেদের হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন নি। তাই মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামের মন্দিরের জন্য মতুয়াদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করাই স্বাভাবিক। হিন্দু সমাজের মধ্যে একাত্মতা নির্মাণে সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মতুয়া সমাজের বর্তমান নেতৃত্বকে হিন্দু সংহতির পক্ষ থেকে সাধুবাদ জানাই।

সীমাবদ্ধ একতাই শক্তি

কোন একটা সুস্পষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে যখন আপনি এগিয়ে যাবেন, তখন সমমনস্ক ব্যক্তিরা আপনাকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবে। এই সমস্ত লোকেদের ত্যাগ তিতিক্ষা আপনার মিশনের শক্তি বাড়াবে। এইভাবে আপনার মিশন ক্রমশঃ প্রচার ও পরিচিতি লাভ করবে। এইবার আপনার এই ক্ষমতা ও শক্তিকে দেখে লোকেরা আপনার সাথে যুক্ত হতে চাইবে।

বাঙালি হিন্দুর মানসিকতার অনুভব এবং কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যারা এইভাবে এগিয়ে আসে তাদের বেশীর ভাগই সমস্যায় পড়ে তার সমাধানের জন্য আপনার শক্তি ও ক্ষমতাকে ব্যবহার করার মানসিকতা নিয়ে আসে। নিজের স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে যোগাযোগ রাখে না। আর সমাধান না হলে সংগঠনকে গালমন্দ করে। এরা এখানে আসে হাত পেতে।

সবাই ধান্দাবাজ নয়। কিছু লোক আসে শেলটার বা প্রোটেকশন পাওয়ার আশায়। তারা সংগঠনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু without any contribution! আপনার নাম ভাঙিয়ে তারা নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে চায়। কিন্তু আপনার মিশনের অগ্রগতির সাথে এদের কোন লেনাদেনা নেই। খালি স্তুতি আর প্রশংসার গ্যাস বেলুন ছাড়া এদের কাছে পাওয়ার কিছু নেই।পাশাপাশি সীমিত লোক আসে হাত উপুড় করে। আপনার মিশনকে নিজের মিশন মনে করে তাকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য উজাড় করে দিয়ে যেতে আসে। এরাই অ্যাসেট।

এইবার আপনি ভাবুন একতা একতা করতে গিয়ে আপনি যদি বহুসংখ্যক লেনেওয়ালা আর অল্পসংখ্যক দেনেওয়ালাকে একসাথে নিয়ে চলতে চান, আপনার মিশনের ভবিষ্যত কি হবে? তাই আপনার মিশনকে সাফল্যের মুখ দেখাতে হলে আপনাকে এই ট্র্যাডিশনাল একতার ভাবনা থেকে শত হাত দূরে থাকতে হবে। আপনাকে ফিল্টার অ্যাপ্লাই করতে হবে। দেনেওয়ালা অল্পসংখ্যক লোকদেরকে অ্যাসেট মনে করতে হবে। এদেরকে আহ্বান করতে হবে। এদেরকে বুক দিয়ে আগলে রাখতে হবে। একতার ভাবনাটাকে এই গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। আর বাকীদেরকে সচেতনভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। কারণ এরা লায়াবিলিটি। এরা আপনাকে পিছনে টেনে ধরে রাখবে, আর use করবে।

আজ আমাদের সমাজের মানসিকতার পরিপ্রেক্ষিতে আমার স্পষ্ট মত – সার্বিক একতা শক্তি নয়, লায়াবিলিটি। তবে দেনেওয়ালাদের মধ্যে একতা অবশ্যই শক্তি এবং এই Restricted বা সীমাবদ্ধ একতা একান্ত কাম্য।

ফসল

‘স্বজাতির মধ্যেই টাকার রোলিং হোক’ কিংবা ‘আরব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আর্থিকভাবে বয়কট করা হোক’- এই সব কথার কথাই থেকে যায় যতক্ষণ না একটা প্রচণ্ড রকম গাঢ় কমিউনিটি ফিলিং বা ভ্রাতৃত্ববোধ সমাজের মধ্যে তৈরি করা যায়। আমাদের সমাজ‌কেই সচেতন কনজিউমার হিসেবে গড়ে তোলা, এই সমাজের মধ্যে থেকেই ব্যবসায়ী তুলে আনা, স্বজাতির মধ্যেই টাকার রোলিং করা- এগুলো যত সহজে ফেসবুকে লেখা যায়, বাস্তবে কাজটা ততটা সহজ নয়। অনেকে হয়তো বলবেন, সমাজের ক’টা লোকের মধ্যে এই বোধ আছে! সত্যি কথা। এইভাবে ভাবার লোকেরা এই সমাজে সংখ্যালঘু। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্য, এই বঙ্গের সংখ্যালঘু সচেতন হিন্দুদের ডিক্সেনারিতে ‘পাখির চোখ’ বলে যদি কোনও শব্দ থেকে থাকে, সেটা হল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন। এর বাইরে অনেক কিছু ভাবলেও তাদের একমাত্র অ্যাক্টিভিটি হল রাজনীতি, থুরি! রাজনীতি নিয়ে চায়ের টেবিলে অথবা সোস্যাল মিডিয়ায় আলোচনা আর সমালোচনা।
উদ্যোগহীন ভাবনার কোনও দাম নেই। ২০১১ তে আমাদের রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছিল। স্মরণ করুন, তার আগে পর্যন্ত আমরা আজকের মত এক‌ই রকমভাবে ভাবতাম- বামশাসনের অবসান হলেই আমাদের উদ্ধার হবে। জমিতে ফসল না বুনে শুধু আগাছা মেরে ফেলে রাখলে সেই জমিতে আবার আগাছাই জন্মায়- এর প্রমাণ বঙ্গবাসী হাতেনাতে পেয়েছে। আজও আমাদের অবস্থা অনেকটা ঘরপোড়া গরুর মত- ২০২১শে যদি পট পরিবর্তন হয় তাহলে আবার সেই আগাছাই জন্মাবে না তো! তাই শুধু ভাবনায় না ভেসে থেকে পজিটিভ কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।
আজ ‘রাজনীতি’ শব্দটার পরিভাষাই বদলে গেছে। নেতাদের মুখে শোনা যায়- ‘করোনা নিয়ে রাজনীতি করবেন না’, ‘ত্রাণ বিতরণ নিয়ে রাজনীতি করবেন না’ ইত্যাদি। ভাবুন তো ভালো সময়েই হোক অথবা বিপর্যয়ের সময়‌ই হোক, রাজাকে তো রাজনীতিই করতে হবে। সুসময়ে রাজার নীতি এক রকম, তো খারাপ সময়ে রাজার নীতি অন্য রকম। কিন্তু এখন জনগণের প্রকৃত সেবা করার ঠিক বিপরীত শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতি করা! এই সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, সেবা করতে হবে, ত্রাণ দিতে হবে কিন্তু রাজনীতি করা যাবে না! অর্থাৎ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সেবা করা- এগুলোকে আজ আর রাজনীতি বলে ধরা হয় না। যদি রাজনীতি করতেই হয়, তাহলে এমন কিছু উদ্যোগ নিন যাতে রাজনীতির সঠিক অর্থটা লোকে আপনাকে দেখে বুঝতে পারে। আর বর্তমানে যাকে রাজনীতি বলা হয়, সেই রাজনীতির দিকে যদি আপনার ঝোঁক থাকে তাহলে আপনাকে একটু আত্মসমীক্ষা করতে হবে বৈকি!
এই পরিমন্ডলে জাতির একটা রেজারেকশন (আমি শব্দটা সচেতন ভাবেই ব্যবহার করছি) আনতে হলে সমাজে একটা চেতনার সঞ্চার করতে হবে। আমরা তোমাকে গদিতে বসিয়ে দিলাম, এবার তুমি যা করার করো। আমার আর কোনও দায়িত্ব নেই, আবার পাঁচ বছর পরে মাঠে নামবো- এই ভাবনা ছাড়তে না পারলে রঘু ডাকাতের বদলে কালু ডাকাত, আর কালু ডাকাতের বদলে লালু ডাকাতের অভিষেকের পরম্পরা চলতেই থাকবে।
তাই সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করুন এবং অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই শুরু করুন। কোনও পার্টির ছাপ না লাগিয়েও এই কাজটা আপনি করতে পারেন। ব্যক্তিস্বার্থে লড়লে আপনাকে একা লড়তে হবে, কমিউনিটির স্বার্থে লড়লে কিছু সহযোদ্ধাকে সাথে পাবেন।
সাংস্কৃতিক আন্দোলন হল গাছের বীজ বপন, অর্থনৈতিক শক্তি সঞ্চয় হল গাছে সারজল দেওয়া এবং ক্ষাত্রশক্তির সাধনা হল সেই গাছকে বেড়া দিয়ে রক্ষা করা- মূলতঃ এগুলোই জাতির রেজারেকশনের চাবিকাঠি। রাজনৈতিক ক্ষমতায় কে বসবে সেটা তো আপনার আমার চাষের ফসলমাত্র! সুতরাং ফসল তোলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকলে দিনের শেষে চোখ খুলে দেখবেন জমিতে শুধু আগাছাই জন্মেছে। সঠিক বীজ লাগান, সারজল দিয়ে পরিচর্যা করুন আর বেড়া দিয়ে রক্ষা করুন- অপেক্ষিত ফসল ফলবেই ফলবে।