পশ্চিমবঙ্গে জনজাগরণ

পশ্চিমবঙ্গে জনজাগরণ! এর মানে কি? বাঙালির জাগরণ ঘটানোর দরকার আছে? বাঙালি এত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে? দেশ হারিয়ে উদ্বাস্তু হ‌ওয়ার যন্ত্রণা! প্রিয়জনের নির্মম হত্যা, ধর্ষণের প্রত্যক্ষদর্শী হ‌ওয়ার যন্ত্রণা! শরীরের রক্ত জল করে গড়ে তোলা বাড়ি, ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যা‌ওয়ার যন্ত্রণা! কার‌‌ও দিদি, কার‌ও বোনকে ভাগ করে নিলো ওরা নিজেদের মধ্যে গণিমতের মাল হিসেবে। এদিকে অসহায়, ফ্যালফ্যাল করে পিছনের দিকে তাকাতে তাকাতে কাঁটাতার পেরিয়ে এপারে চলে আসা বাঙালি, বুকে আজও সেই অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে? ওপারে মালাউনের বাচ্চা, এপারে রিফিউজির বাচ্চা তকমা নিয়ে বাঙালি ঘুমায় কিভাবে! ওপারের নোয়াখালী, ভৈরবের চরের রক্তাক্ত পথ ধরে এপারের নলিয়াখালি, দেগঙ্গা, বাদুড়িয়া, ধূলাগড়, বগাখালিতে পৌঁছে বাঙালি আজ ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে! আমি বিশ্বাস করি না বাঙালি ঘুমিয়ে আছে। তাই তাকে জাগানোর চেষ্টা করোর কোনও প্রয়োজন নেই। বাঙালি প্রতি মুহূর্তে চিৎকার করে তার যন্ত্রণাকে ব্যক্ত করতে চায়। কিন্তু তার কথা শোনে কে? সেকুলারিজম আর লিবারালিজমের ভন্ডামির ঢাকের আওয়াজে বাঙালির এই চিৎকার চাপা পড়ে আছে আজও। তাই প্রশ্ন হলো আজ কে কাকে জাগাবে? যারা জনজাগরণ করতে চাইছে তারা নিজেরাই আগে জাগ্রত হয়ে কান পাতুক বাঙালির মনের মণিকোঠায়। জানার চেষ্টা করুক বাঙালির সামনে প্রায়োরিটি কি – রাজ্যব্যাপী অসংখ্য স্থানে মগরাহাটের সেলিম, জীবনতলার সৌকত মোল্লা, সরবেড়িয়ার সাজাহান শেখ, হাসনাবাদের বাবু মাস্টার, কীর্ণাহারের মনিরুল, ভাঙ্গড়ের আরাবুল-কাইজার, মিনাখাঁর আয়ুব গাজীদের পরিচালিত সমান্তরাল জেহাদী শাসনের অবসান, নাকি ইলেকট্রিক বিলের খরচা কমানো।

ফসল

‘স্বজাতির মধ্যেই টাকার রোলিং হোক’ কিংবা ‘আরব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে আর্থিকভাবে বয়কট করা হোক’- এই সব কথার কথাই থেকে যায় যতক্ষণ না একটা প্রচণ্ড রকম গাঢ় কমিউনিটি ফিলিং বা ভ্রাতৃত্ববোধ সমাজের মধ্যে তৈরি করা যায়। আমাদের সমাজ‌কেই সচেতন কনজিউমার হিসেবে গড়ে তোলা, এই সমাজের মধ্যে থেকেই ব্যবসায়ী তুলে আনা, স্বজাতির মধ্যেই টাকার রোলিং করা- এগুলো যত সহজে ফেসবুকে লেখা যায়, বাস্তবে কাজটা ততটা সহজ নয়। অনেকে হয়তো বলবেন, সমাজের ক’টা লোকের মধ্যে এই বোধ আছে! সত্যি কথা। এইভাবে ভাবার লোকেরা এই সমাজে সংখ্যালঘু। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্য, এই বঙ্গের সংখ্যালঘু সচেতন হিন্দুদের ডিক্সেনারিতে ‘পাখির চোখ’ বলে যদি কোনও শব্দ থেকে থাকে, সেটা হল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন। এর বাইরে অনেক কিছু ভাবলেও তাদের একমাত্র অ্যাক্টিভিটি হল রাজনীতি, থুরি! রাজনীতি নিয়ে চায়ের টেবিলে অথবা সোস্যাল মিডিয়ায় আলোচনা আর সমালোচনা।
উদ্যোগহীন ভাবনার কোনও দাম নেই। ২০১১ তে আমাদের রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছিল। স্মরণ করুন, তার আগে পর্যন্ত আমরা আজকের মত এক‌ই রকমভাবে ভাবতাম- বামশাসনের অবসান হলেই আমাদের উদ্ধার হবে। জমিতে ফসল না বুনে শুধু আগাছা মেরে ফেলে রাখলে সেই জমিতে আবার আগাছাই জন্মায়- এর প্রমাণ বঙ্গবাসী হাতেনাতে পেয়েছে। আজও আমাদের অবস্থা অনেকটা ঘরপোড়া গরুর মত- ২০২১শে যদি পট পরিবর্তন হয় তাহলে আবার সেই আগাছাই জন্মাবে না তো! তাই শুধু ভাবনায় না ভেসে থেকে পজিটিভ কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।
আজ ‘রাজনীতি’ শব্দটার পরিভাষাই বদলে গেছে। নেতাদের মুখে শোনা যায়- ‘করোনা নিয়ে রাজনীতি করবেন না’, ‘ত্রাণ বিতরণ নিয়ে রাজনীতি করবেন না’ ইত্যাদি। ভাবুন তো ভালো সময়েই হোক অথবা বিপর্যয়ের সময়‌ই হোক, রাজাকে তো রাজনীতিই করতে হবে। সুসময়ে রাজার নীতি এক রকম, তো খারাপ সময়ে রাজার নীতি অন্য রকম। কিন্তু এখন জনগণের প্রকৃত সেবা করার ঠিক বিপরীত শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতি করা! এই সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, সেবা করতে হবে, ত্রাণ দিতে হবে কিন্তু রাজনীতি করা যাবে না! অর্থাৎ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সেবা করা- এগুলোকে আজ আর রাজনীতি বলে ধরা হয় না। যদি রাজনীতি করতেই হয়, তাহলে এমন কিছু উদ্যোগ নিন যাতে রাজনীতির সঠিক অর্থটা লোকে আপনাকে দেখে বুঝতে পারে। আর বর্তমানে যাকে রাজনীতি বলা হয়, সেই রাজনীতির দিকে যদি আপনার ঝোঁক থাকে তাহলে আপনাকে একটু আত্মসমীক্ষা করতে হবে বৈকি!
এই পরিমন্ডলে জাতির একটা রেজারেকশন (আমি শব্দটা সচেতন ভাবেই ব্যবহার করছি) আনতে হলে সমাজে একটা চেতনার সঞ্চার করতে হবে। আমরা তোমাকে গদিতে বসিয়ে দিলাম, এবার তুমি যা করার করো। আমার আর কোনও দায়িত্ব নেই, আবার পাঁচ বছর পরে মাঠে নামবো- এই ভাবনা ছাড়তে না পারলে রঘু ডাকাতের বদলে কালু ডাকাত, আর কালু ডাকাতের বদলে লালু ডাকাতের অভিষেকের পরম্পরা চলতেই থাকবে।
তাই সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করুন এবং অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই শুরু করুন। কোনও পার্টির ছাপ না লাগিয়েও এই কাজটা আপনি করতে পারেন। ব্যক্তিস্বার্থে লড়লে আপনাকে একা লড়তে হবে, কমিউনিটির স্বার্থে লড়লে কিছু সহযোদ্ধাকে সাথে পাবেন।
সাংস্কৃতিক আন্দোলন হল গাছের বীজ বপন, অর্থনৈতিক শক্তি সঞ্চয় হল গাছে সারজল দেওয়া এবং ক্ষাত্রশক্তির সাধনা হল সেই গাছকে বেড়া দিয়ে রক্ষা করা- মূলতঃ এগুলোই জাতির রেজারেকশনের চাবিকাঠি। রাজনৈতিক ক্ষমতায় কে বসবে সেটা তো আপনার আমার চাষের ফসলমাত্র! সুতরাং ফসল তোলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকলে দিনের শেষে চোখ খুলে দেখবেন জমিতে শুধু আগাছাই জন্মেছে। সঠিক বীজ লাগান, সারজল দিয়ে পরিচর্যা করুন আর বেড়া দিয়ে রক্ষা করুন- অপেক্ষিত ফসল ফলবেই ফলবে।