পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে হিন্দুরা আর কতদিন

অযোধ্যার রামমন্দির হিন্দুদের আবেগের প্রতীক।প্রত্যেক শুক্রবার, বিশেষতঃ ঈদের দিন আনলক রেখে বিচ্ছিন্নভাবে ৫ই আগস্ট, রামমন্দিরের ভূমিপূজনের দিনটাতে লকডাউন ঘোষণা করে এই সরকার সরাসরি হিন্দুদের আবেগে আঘাত করেছে। এটা কি ঠিক তোষণ? না কি এটা তোষণের পরবর্তী পর্যায়? তৃণমূলের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে তাদের রাজনৈতিক শত্রুতা হল বিজেপির সাথে, ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের সাথে নয়, এমনকি রামভক্ত হিন্দুদের সাথেও নয়। শাসকদলের এই সমস্ত সিদ্ধান্ত দেখে মনে হচ্ছে তৃণমূল দলটার লড়াই যেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিরুদ্ধে এবং তাঁর ভক্তদের বিরুদ্ধে! যত দিন যাচ্ছে এই দলটা শুধুমাত্র মুসলিম তোষণকারী হিসেবে নয়, হিন্দুর শত্রু হিসেবেই যেন নিজেকে চিহ্নিত করে ফেলছে। এই হিন্দু বিরোধী তকমা ঝেড়ে ফেলতে হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে, এবং সেটাও খুব কম সময়ে। আর উনি এবং ওনার দল যদি বিজেপি বিরোধিতা করতে গিয়ে গোটা হিন্দু সমাজের বিরোধী অবস্থানে নিজেদের নিয়ে চলে যান তবে ২০২১শে তাদের মহাবিপর্যয় সুনিশ্চিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে রাখা উচিৎ, সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক এখনও হিন্দুরাই, মুসলমানরা নয়। তাই হিন্দুর আবেগকে আহত করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না।

কিন্তু এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভোটের এবং ২০২১শে ক্ষমতা দখলের প্রধান দাবিদার বিজেপির পক্ষ থেকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ, এমনকি সমালোচনা পর্যন্ত চোখে পড়ছে না কেন? হিন্দুর আবেগ আহত হলে তাদের কিছু যায় আসে না? বঙ্গবিজেপি কি হিন্দুদের ভোটকে Taken for granted ধরে নিয়েছে?

‘হিন্দু ব্যাটারা আর ভোট দেবে কাকে’? ‘বিজেপি ছাড়া বিকল্প আর জায়গা কোথায়’? হিন্দু সংগঠনগুলো তো আছেই চেচামেচি করার জন্য। আর আমরা আছি ফ্রি-তে তার লাভ নেওয়ার জন্য! তাই চুপচাপ থাকাই ভালো। আর হিন্দু সংগঠনগুলো বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেললে সহজেই স্টেটমেন্ট দিয়ে দেওয়া যাবে- ”ওদের সাথে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। ওরা গুন্ডা বদমাইশদের দল”….. ইত্যাদি ইত্যাদি। তাতে মুসলিম ভোটারদের সামনেও নিজেদের সেকুলার ইমেজটা বজায় থাকে। কারণ ওদের ভোট না পেলে পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতা দখল করা অসম্ভব- বঙ্গবিজেপির নেতৃত্বের ভাবনাটা এইরকম নয়তো? এই ভাবনা নিয়েই যদি তারা চলে, তাহলে বিজেপি এই রাজ্যে ক্ষমতায় এলেও হিন্দুর কোনও লাভ হবে না। কারণ ক্ষমতায় এলেও এরা হিন্দুর আবেগকে মর্যাদা দেবে না।

মুসলমানরা শাসক দলকেও কব্জায় রেখেছে, পাশাপাশি ক্ষমতার দাবিদার বঙ্গবিজেপিকে মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের লোভ দেখাতেও সফল হচ্ছে।

আর হিন্দুরা? ……একটু গভীর ভাবে ভাবুন… নিজেকে প্রশ্ন করুন… নিজেদের ভোটের মূল্য না বুঝলে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দর কষাকষি করতে না পারলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে হিন্দুরা আর কতদিন বসে থাকতে পারবে? এই ”কতদিন”- এর কাউন্ট‌ই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ও বাঙ্গালীর অস্তিত্বের সময়সীমা।

পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যত হোক পশ্চিমবঙ্গই – পশ্চিম বাংলাদেশ নয়

আজকেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ইন্দিরা আবাস, বেকার ভাতা, বিধবা ভাতা, বিপিএল কার্ড, ব্যাঙ্ক লোন থেকে শুরু করে সবুজায়ন – শিল্পায়ন – রাস্তাঘাট – কর্মসংস্থান অর্থাৎ ব্যক্তিগত এবং কিছুটা সমষ্টিগত উন্নতির চার দিকে আবর্তিত হচ্ছে৷ স্বাভাবিক অবস্থায় এটাই কাম্য৷ কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এর পরিণাম সম্পর্কে উদাসীনতা দেখে মনে হচ্ছে আমরা বাড়িতে টাকা-পয়সা, সোনাদানা, দামী আসবাবপত্র সংগ্রহ করার নেশায় বাড়িতে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় শক্ত দরজা জানলা লাগানোর কথাটা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি৷ আমরা ঘরপোড়া গরু, কিন্তু সিঁদুরে মেঘ দেখেও না দেখার ভান করছি৷ যেদিন ধর্মের ভিত্তিতে বঙ্গদেশ ভাগ হয়েছিল, সেদিন কি শুধু অধুনা পূর্ববঙ্গের বাঙালী হিন্দুর পরাজয় হয়েছিল? আমরা, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরাও কি সেদিন সেই ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদের সামনে আত্মসমর্পণ করি নি? ইদানীং পশ্চিমবঙ্গের ২৭% মুসলিমদের পক্ষ থেকে মুসলিম নেতারা ৪৮টি বিধানসভা সিটের ভাগ্যবিধাতা বলে নিজেদের ঘোষণা করে কি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন? নাকি এই চ্যালেঞ্জটা আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসী বাঙালীর সামনে? আগামী পাঁচ বছর পরেও কি সংখ্যাটা ৪৮ই থাকবে? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামের পাশে কোন হিন্দু পদবী আর কতদিন শোভা পাবে? এই সব প্রশ্নের শেষ কোথায়? শেষ প্রশ্নগুলি অবশ্যই এই রকম – পশ্চিমবঙ্গ কবে কাশ্মীরে পরিণত হবে? পশ্চিমবঙ্গ কবে হিন্দুবিহীন হবে? পশ্চিমবঙ্গ কবে বাংলাদেশ হয়ে যাবে?


মোদ্দা কথা অধিকাংশ বাঙ্গালী ভয়ে এই সব প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছে৷ মানসিক ভাবে তারা হার মেনে নিয়েছে৷ না হলে বেড়া না দিয়ে সব্জী চাষ করার মত নির্বোধের কাজ অন্তত বাঙ্গালী বুদ্ধির সাথে ম্যাচ করে না৷ সাহস অবলম্বন করুন৷ আসুন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের কথা ভেবে কিছুদিনের জন্য ইন্দিরা আবাস আর চাকরীর কথা ভুলে যাই৷ আপনার আজকের নীরবতা আপনার সন্তানকে প্রতিদিন একটু একটু করে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আসুন, শপথ করি- পশ্চিমবঙ্গকে কাশ্মীর হতে দেব না৷ পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাঙালীয়ানাকে হারিয়ে যেতে দেব না৷ জলকে জল না বলে পানি বলার মত পরিস্থিতি হতে দেব না৷ আমরা স্নান করবো, গোসল করতে বাধ্য হব না৷ আমরা যদি চেক লুঙ্গি পরি, সেটা পরবো নিজের ইচ্ছায়, বাধ্য হয়ে নয়৷

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে পৌষ মেলা হবে, চড়কপূজা হবে৷ মা কালী পাঁঠার মাথা খাবে, বুড়ো শিব ডুগডুগি বাজাবে৷ মা দুর্গাকে বিদায় দিতে গিয়ে দশমীর দিন আমার মায়েরা চোখের জল ফেলবে৷ লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে আমার বোনেরা সরস্বতী পূজো করবে, কালো বোরখার অন্ধকারে তারা হারিয়ে যাবে না৷ বাঙ্গালীর মনে বীরভূমের বাউল, মালদার গম্ভীরা আর পুরুলিয়ার ছৌ-নৃত্যের স্থান আলকাফ আর জালসা কোনদিন নিতে পারবে না – চলুন, এই স্বপ্ন নিয়ে সব নেতাদের কাছে একবার আমরা যাই৷ চলুন জেনে আসি কে পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গই রাখতে চায়৷ তারপরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি আমার পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে বিধানসভা পর্যন্ত সমস্ত ক্ষমতা আমরা কাদের হাতে তুলে দেব৷ পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যত হোক পশ্চিমবঙ্গই – পশ্চিম বাংলাদেশ নয়৷

পশ্চিমবঙ্গে জনজাগরণ

পশ্চিমবঙ্গে জনজাগরণ! এর মানে কি? বাঙালির জাগরণ ঘটানোর দরকার আছে? বাঙালি এত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে? দেশ হারিয়ে উদ্বাস্তু হ‌ওয়ার যন্ত্রণা! প্রিয়জনের নির্মম হত্যা, ধর্ষণের প্রত্যক্ষদর্শী হ‌ওয়ার যন্ত্রণা! শরীরের রক্ত জল করে গড়ে তোলা বাড়ি, ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যা‌ওয়ার যন্ত্রণা! কার‌‌ও দিদি, কার‌ও বোনকে ভাগ করে নিলো ওরা নিজেদের মধ্যে গণিমতের মাল হিসেবে। এদিকে অসহায়, ফ্যালফ্যাল করে পিছনের দিকে তাকাতে তাকাতে কাঁটাতার পেরিয়ে এপারে চলে আসা বাঙালি, বুকে আজও সেই অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে? ওপারে মালাউনের বাচ্চা, এপারে রিফিউজির বাচ্চা তকমা নিয়ে বাঙালি ঘুমায় কিভাবে! ওপারের নোয়াখালী, ভৈরবের চরের রক্তাক্ত পথ ধরে এপারের নলিয়াখালি, দেগঙ্গা, বাদুড়িয়া, ধূলাগড়, বগাখালিতে পৌঁছে বাঙালি আজ ঘুমিয়ে থাকে কিভাবে! আমি বিশ্বাস করি না বাঙালি ঘুমিয়ে আছে। তাই তাকে জাগানোর চেষ্টা করোর কোনও প্রয়োজন নেই। বাঙালি প্রতি মুহূর্তে চিৎকার করে তার যন্ত্রণাকে ব্যক্ত করতে চায়। কিন্তু তার কথা শোনে কে? সেকুলারিজম আর লিবারালিজমের ভন্ডামির ঢাকের আওয়াজে বাঙালির এই চিৎকার চাপা পড়ে আছে আজও। তাই প্রশ্ন হলো আজ কে কাকে জাগাবে? যারা জনজাগরণ করতে চাইছে তারা নিজেরাই আগে জাগ্রত হয়ে কান পাতুক বাঙালির মনের মণিকোঠায়। জানার চেষ্টা করুক বাঙালির সামনে প্রায়োরিটি কি – রাজ্যব্যাপী অসংখ্য স্থানে মগরাহাটের সেলিম, জীবনতলার সৌকত মোল্লা, সরবেড়িয়ার সাজাহান শেখ, হাসনাবাদের বাবু মাস্টার, কীর্ণাহারের মনিরুল, ভাঙ্গড়ের আরাবুল-কাইজার, মিনাখাঁর আয়ুব গাজীদের পরিচালিত সমান্তরাল জেহাদী শাসনের অবসান, নাকি ইলেকট্রিক বিলের খরচা কমানো।