মাৎসন্যায় এবং যুগধর্ম

পুকুরে মাছেরা যখন একসাথে থাকে তখন কয়েকটি আগ্রাসী প্রকৃতির মাছ বাকী মাছেদের আক্রমণ করে মেরে ফেলে৷ কে কাকে মারবে, সবক্ষেত্রে তা মাছের আকারের উপরে নির্ভর করে না৷ তা মূলতঃ নির্ভর করে মাছের প্রকৃতি বা স্বভাবের উপরে৷ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বোয়াল বা ভেটকী মাছের কথা৷ কোন পুকুরে বোয়াল অথবা ভেটকী মাছ থাকলে সেই পুকুরে অন্য কোন প্রজাতির মাছ থাকতে পারে না৷ এক্ষেত্রে বোয়াল এবং ভেটকী মাছ অন্য মাছদের আক্রমণ করে এবং খেয়ে ফেলে৷ আবার তেলাপিয়া মাছের বংশবৃদ্ধির হার এত বেশী যে তাদের ভীড়ের চাপে পুকুরে অন্য মাছের স্থান এবং খাদ্য-দুইয়েরই অভাব হয়ে পড়ে৷ সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার মিষ্টি জলের পুকুরে কাঠকৈ নামের মাছ পাওয়া যায়৷ এরা আকারে ছোট কিন্তু দলবদ্ধ এবং হিংস্র৷ এরা দল বেঁধে অনেক বড় বড় মাছকে শিকার করে৷ পুকুরে এই তিন ধরণের মাছের যে কোন এক প্রজাতির উপস্থিতিই বাকী সব প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব শেষ করার জন্য যথেষ্ট৷ আর যদি এরকম কোন মাছ থাকে, যার আকার বড়, যারা দলবদ্ধ, হিংস্র ও আগ্রাসী তাহলে তো আর কথাই নেই৷

এখন অনেকে বলবেন মাছ তো মাছই, সব মাছই সমান, যারা মাছে মাছে পার্থক্য করে তারা অজ্ঞ৷ তাদের এই কথা এক অর্থে সঠিক হলেও তাদের কথা শুনে কেউ যদি একই পুকুরে সাধারণ মাছের সাথে সাথে বোয়াল, ভেটকী ইত্যাদি মাছ চাষ করেন, তাহলে তিনি সর্বস্বান্ত হবেন একথা বলাই বাহুল্য৷ ঠিক তেমন ভাবে যারা বলেন মানুষ তো মানুষই, সব মানুষ সমান, মানুষে মানুষে বিভেদ করা উচিত নয় – তাদের কথা আপাত দৃষ্টিতে সত্যি এবং আকর্ষণীয় মনে হলেও মোটেই বাস্তব সম্মত নয়৷ কারণ সবাই মানুষ হলেও আপনি কি আপনার বাড়ীর ভিতরে আপনার পরিবারের সদস্যদের সাথে একজন চোর, একজন সিরিয়াল কিলার এবং একজন দাগী ধর্ষণকারীকে একসাথে বসবাস করার অনুমতি দেবেন? যদি দেন তাহলে তার পরিণতি কি হবে, তা আশা করি বলে দিতে হবে না৷

মানুষ সবাই সমান হলেও আবার সবাই সমান নয়৷ বাস্তব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছ ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে এই পার্থক্য বোঝা যায়৷ বস্তুবাদী(materialistic) অথবা আধ্যাত্মিক(spiritual) – যে কোন ভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সব কিছুর মূলতত্ত্ব একই৷ সেই দৃষ্টিতে একটি সূস্থ কুকুর আর একটি পাগল কুকুরের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, উভয়েই কুকুর৷ কিন্তু তাই বলে কি পাগল কুকুরের সাথে গলাগলি করা কান্ডজ্ঞানের পরিচায়ক হবে? কেউ যদি তা করতে চায় তাহলে সে খালি নিজেরই নয়, আরও অনেকের বিপদ ডেকে আনবে৷ এখন আমাদের সমাজের মধ্যেই কিছু লোকের মনে হচ্ছে যে আমরাই শ্রেষ্ঠ, বাকীরা নিকৃষ্ট৷ সমস্ত জড়বস্তু, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নারীজাতি – সবই আমাদের উপভোগের জন্য ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন৷ আমরা যা বিশ্বাস করি, সেটাই একমাত্র সঠিক এবং সবাইকে সেটাই বিশ্বাস করতে হবে৷ আমরা যে পথে চলতে চাই বাকীদেরকেও সেই পথেই চলতে হবে৷ অন্যথা হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে অনন্ত কাল ধরে যুদ্ধ করবো৷ তাদের সবাইকে হত্যা করবো৷ তাদের সম্পত্তি লুঠ করবো৷ তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করবো, দাসী বানিয়ে খোলা বাজারে নিলাম করবো৷ এটাই পূণ্যের কাজ৷ এটাই স্বর্গ প্রাপ্তির উপায়৷ এটাই ঈশ্বর নির্দিষ্ট পবিত্র কর্তব্য৷ এই কাজ নিষ্ঠার সাথে করলে ঈশ্বর খুশী হবেন এবং আশির্বাদ করবেন৷ এভবেই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে৷ এই বিশ্বাসই হল সমস্ত আব্রাহামিক মতাদর্শের মূল ভিত্তি ৷

পাশাপাশি কিছু লোক মনে করে সবারই চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস, অভিব্যক্তির স্বাধীনতা আছে যতক্ষণ পর্যন্ত তা বাকীদের উপরে বিরূপ প্রভাব না ফেলছে৷ তারা মনে করে জীব-জড় সম্বলিত এই প্রকৃতি ঈশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপের বহিপ্রকাশ মাত্র৷ তাই তারা সর্ব জীবে শিব দেখে৷ তাই তারা সঙ্ঘর্ষ নয়, সমন্বয়কেই শান্তির একমাত্র উপায় বলে মনে করে৷ এই চিন্তাধারা হল ভারতের মাটিতে উদ্ভূত সকল মতাদর্শের মূল ভিত্তি৷

এখন প্রশ্ন হলো, উপরোক্ত দুই ধরণের মনুষ কি সমান? উভয় প্রকারের চিন্তা ভাবনাই কি সমান পর্যায়ের? উভয় প্রকারের চিন্তা ভাবনাই কি সমানভাবে সকলের জন্য মঙ্গলকারী? পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিরিখে, মানবের সার্বিক বিকাশের জন্য যোগ্য পরিবেশ তৈরীর নিরিখে দুই ধরণের চিন্তাই কি সমান ভাবে কার্যকারী? নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে উত্তর হবে ‘না’৷

তাহলে সব ধর্মমত সমান, সব ধর্মের সার এক ইত্যাদি কথা প্রচার করে থাকেন, তারা কী যুক্তিতে কথাগুলি বলছেন- তা সর্ব সমক্ষে জিজ্ঞাসা করা কি আমাদের উচিত নয়? তারা যখন বলেন গীতা-কোরাণ-বাইবেলে একই কথা লেখা আছে, তখন কি আমাদের একটু যাচাই করে নেওয়া উচিত নয় যে বক্তা ওই ধর্মগ্রন্থগুলি আদৌ পড়েছেন কি না?

ভারতবর্ষকে ধ্বংস করার জন্য এক বিরাট চক্রান্ত চলছে৷ হিন্দুদের বিভ্রান্ত করে হীনবল করে রাখা হচ্ছে৷ এখানে একই পুকুরে আমাদের মত রুই-কাতলার সাথে বোয়াল-তেলাপিয়ার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অবাস্তব স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে৷ এর পরিণাম হল সম্পূর্ণ ভারতের ইসলামিকরণ৷ হিংসা আর প্রেম কখনও এক হয় না৷ সঙ্ঘর্ষ আর সমন্বয় কোনদিনও এক হতে পারে না৷ হিংসা ও সঙ্ঘর্ষ হল অধর্ম আর প্রেম ও সমন্বয় হল ধর্ম৷ তবে ধর্মের এই সংজ্ঞা প্রযোজ্য হবে সাধরণ পরিস্থিতিতে ৷ কিন্তু যখনই অধর্ম মাথা তুলবে, ধর্মের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, তখন ধর্ম পালনের থেকে ধর্মের সংরক্ষণকেই প্রাথমিকতা দিতে হবে৷ আর যুদ্ধক্ষেত্রে ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ’ হল থাম্বরুল, সে কথা ভগবান শ্রীরাম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন৷ অধর্মের বিনাশ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে হিংসা ও সঙ্ঘর্ষের পথ অবলম্বন করাই যে সব থেকে বড় ধর্ম তা বোঝানোর জন্য ভগবান স্বয়ং বারবার অস্ত্রধারণ করেছেন৷ কখনও নৃসিংহদেব, কখনও রামচন্দ্র হয়ে নিজের হাতে হিরণ্যকশিপু, রাবণ বধ করেছেন৷ কখনও শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আত্মীয় স্বজনদের হত্যা করতে পান্ডবদের প্রেরণা দিয়েছেন৷ আজ এই দেশ-ধর্ম রক্ষা করতে হলে ভগবান প্রদর্শিত এই পথেই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে৷ এই ধর্মপথ ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই৷